কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের কৃষিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটছে। একসময় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে চাষ হওয়া পাট, গম, কাউন, পটল, বেগুন ও বাদামের মতো ফসলের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন অনেক কৃষক। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা, শ্রমিক সংকট এবং বাজারমূল্যের অনিশ্চয়তার কারণে কৃষকরা ক্রমেই ঝুঁকছেন বিকল্প ফসলের দিকে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক আচরণ জেলার কৃষিকে অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। কখনও দীর্ঘ সময় বৃষ্টির দেখা মিলছে না, আবার কখনও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না কৃষকরা।
বিশেষ করে পাটচাষে খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাট কাটার পর জাগ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব এবং সময়মতো শ্রমিক না পাওয়ায় কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হচ্ছে। একইভাবে গম ও কাউন চাষের জন্য প্রয়োজনীয় অনুকূল আবহাওয়া আগের মতো স্থিতিশীল না থাকায় উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার কারণে সবজি ও বাদাম চাষে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই মাঠেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ফসল, ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের চেরেঙ্গা এলাকার কৃষক মো. শাহীন আলী মণ্ডল জানান, গত বছর দুই একর জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। কিন্তু সময়মতো শ্রমিক না পাওয়া এবং পাট জাগ দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পানি না থাকায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েন। এ বছর কৃষি অফিস থেকে পাটের বীজ পেলেও সার পাননি। বাজারে সারের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি এবার কোনো ফসল আবাদ করেননি।
একই এলাকার কৃষক রফিকুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, “গেল বছর মুই ভালো বীজ পাঙ নাই, তার উপরোত হুট করি পানি বলা (আকষ্মিক বন্যা) শুরু হইল, মোর ১ একর জমির বাদাম নষ্ট হয়া গেইছে”।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পলাশবাড়ী এলাকার হালমাঝিপাড়া গ্রামের কৃষক মো. নুরুল হক জানান, গত বছর সূর্যমুখী চাষ করে প্রতি মণ ৫ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। তবে এ বছর দাম কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৪০০ টাকায়। ফলে তিনি তিন একর জমিতে পটল ও বেগুন চাষ করেন। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে পটল গাছে পচন ধরে এবং বেগুনক্ষেতে আগাছার বিস্তার ঘটায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে তিনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
একই এলাকার কৃষক পাপ্পু মিয়া ও আশরাফুল হক বাবু জানান, অতিবৃষ্টির কারণে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তারা চার একর জমিতে এখনও কোনো ফসল আবাদ করেননি।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীভাঙন ও চরাঞ্চলের পরিবর্তিত পরিবেশও জেলার কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ভূমির প্রকৃতি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কৃষকদের প্রচলিত কৃষি পরিকল্পনা এখন আর আগের মতো কার্যকর থাকছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে খরা-সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি জাতের ফসল নির্বাচন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী বপন ও রোপণ, সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ এবং পানি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকদের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা কৃষি অফিসার মোছাঃ নাহিদা আফরীন বলেন,”চলতি আবহাওয়ায় ক্ষতি এড়াতে কৃষকরা লতিকচু, মুখিকচু, ঢ্যাঁড়শ এবং মরিচের (বিজলী প্লাস-২০২০, ধুমকেতু, নাগা ফায়ার) মতো সহনশীল জাতগুলো চাষ করা যেতে পারে। এছাড়া বারি তিল-৩ জাতের তিল চাষেও ভালো ফলন সম্ভব। আর অতিবৃষ্টির সময়ে শাকসবজি চাষ করতে চাইলে অবশ্যই জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের ভালো ব্যবস্থা রাখতে হবে।” বর্তমান আবহাওয়ার জন্য পাটের ক্ষেত্রে ‘এআরআই তোসা পাট-৯’, ভুট্টার ক্ষেত্রে ‘পাইনিয়ার-৩৩৫৫ ও ডিকাল্প-৯২১৭’, ‘বারি গম-৩৩’ এবং ‘কাউন ১/২’ জাতগুলো একদম উপযোগী।
তিনি আরও বলেন, কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে লক্ষ্যে প্রান্তিক কৃষকদের সঙ্গে বড় কোম্পানিগুলোর সরাসরি সংযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে কুড়িগ্রামের কৃষি এখন এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থাপনা না হলে জেলার ঐতিহ্যবাহী অনেক ফসলের আবাদ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।