গত কয়েক দিন তীব্র গরমে ছটফট করছিল রাজধানী ঢাকার বাসিন্দারা। অবশেষে গতকাল শনিবারের দীর্ঘ প্রতিক্ষার এক পশলা বৃষ্টিতে কমতে শুরু করছে তাপমাত্রা। এতে নগরবাসীর মধ্যে ফিরছে স্বস্তি। গত কয়েকদিন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় পুরো নগরী ধুলায় ভরে গেছে। এতে গরমের পাশাপাশি ধুলাবালুতে একাকার হয় নগরবাসী। ফলে এ বৃষ্টিতে ধুলোমাখা ঢাকা যেন ধুয়ে-মুছে সতেজ হয়ে উঠছে। ফলে বৃষ্টিভেজা রাজধানী পেয়েছে এক ভিন্ন রূপ। তবে বৃষ্টি না হলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে নিয়মিত সড়কে পানি ছিটিয়ে ধুলা নিধনের আহবান জানিয়েছেন নগরবাসী। এদিকে, এক পূর্বাভাসে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় তাপমাত্রা সামনে আরো প্রশমিত হতে পারে। একই সাথে দেশের আট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণও হতে পারে। তবে আবহাওয়া প্রধানত শুষ্ক থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এ সময় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেকদিন যাবত বৃষ্টিপাত না হলে রাজধানীতে বসবাসকারীদের জন্য বায়ুদূষণ নিত্য দিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এ দূষণের কারণে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে নগরবাসী। মূলত ধুলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই গত কয়েকদিন বায়ুদূষণ এতোই বেড়েছে যে সড়কে চলাচলকারীদের পাশাপাশি বাসায় অবস্থানকারীদেরও এ দূষণের কবলে পড়তে হচ্ছে। ফলে প্রায় বিশ্বে দূষিত বায়ুর শহরের তালিকায় এক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকছে ঢাকা। তবে আশার আলো গতকাল এক পশলা বৃষ্টিতে আপাতত ধুলা কমেছে।
জানা গেছে, গতকাল ছুটির দিনে ঢাকার একিউআই স্কোর ১১৬ ছিল। যা সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ারের তথ্যানুযায়ী রাজধানী ঢাকার বায়ুর মান সূচক বা একিউআই স্কোর হলো ১১৬, বাতাসের মান ‘সংবেদনশীলদের জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমন অবস্থায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ঘরের ভেতরে থাকা এবং অন্যদের বাইরের কার্যক্রম সীমিত রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকায় বর্ষায় বায়ুদূষণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও অন্য মৌসুমে এর পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। মূলত ধূলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বায়ুদূষণ বাড়ছে। আর ধূলা বেড়ে যাওয়াসহ নানা কারণে বারবার বায়ুদূষণের তালিকায় প্রায় ঢাকা শীর্ষ অবস্থানে থাকছে। তবে গতকাল বৃষ্টি হওয়ায় এ দূষণের মাত্রা অনেক কম থাকায় খুশি নগরবাসী। এ ধারা অব্যাহত রাখতে বৃষ্টি না হলেও নিয়মিত সড়কে পানি ছিটানোসহ নানা কার্যক্রম চালাতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের জোড়ালো ভূমিকা রাখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, রাজধানীর চার হাজার ১০৭টি সড়ক রয়েছে। আর এর দৈর্ঘ্য দুই হাজার ২৮৯ কিলোমিটার। এসব সড়কের কোথাও না কোথাও প্রতি বছরই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এ খোঁড়াখুঁড়িকে কেন্দ্র করে ধূলা দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। তবে প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে মাঝে মধ্যে পানি ছিটালেও ছোট সড়কে কখনই পানি না ছিটানোয় ধূলা নিধন হচ্ছে না। আর এর থেকেই ঢাকার বায়ুর মান দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আর নিশ্বাসের মাধ্যেমে খারাপ বায়ু শরীরে ঢুকে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। এদিকে, প্রায় দূষণের তালিকায় ঢাকার শীর্ষে চলে আসার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন পরিবেশবাদীরা। তাদের মতে, বিভিন্ন প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলায় বায়ুদূষণ বাড়ছে। যেকোনো ধরনের নির্মাণ কাজের সময় বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে সেসব নিয়ম পালন করছে না সংশ্লিষ্টরা। তবে রাজধানীর বায়ুদূষণের জন্য বিশেষজ্ঞরা দুই সিটি করপোরেশনকে দুষছেন। কারণ সড়কে নিয়মিত পানি ছিটায় না সিটি করপোরেশন। তবে এর সম্পূর্ণভাবে দ্বিমত পোষণ করেছেন দুই সিটি। উত্তর সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বায়ুদূষণ রোধে সকাল-বিকাল গাড়ির মাধ্যমে মহাসড়কে নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে। যারফলে ঢাকার বাতাস উন্নতির দিকে যাচ্ছে। তবে মহাসড়কে মাঝেমধ্যে পানি ছিটাতে দেখা গেলেও গলিতে ছিটানো হচ্ছে না। ফলে ধূলা বাতাসের মাধ্যেমে বাসাবাড়িতেও ঢুকছে।
এদিকে, গত কয়েকদিনে প্রখর রোদ আর ভ্যাপসা গরমে ঘরের বাইরে বের হওয়াই ছিল কষ্টকর। শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন এই দাবদাহে। এরই মধ্যে গতকাল শনিবার দুপুরের পর হঠাৎ করেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে যায়। বিকেল গড়াতে নামে এক পশলা বৃষ্টি। এই বৃষ্টির সঙ্গে বইতে থাকা শীতল বাতাসে কমতে শুরু করে তাপমাত্রা। এতে ধুলোমাখা নগরী ধুয়ে-মুছে অনেকটা সতেজ হয়ে ওঠেছে। কোথাও কোথাও শিশু কিশোররা বৃষ্টিতে ভিজতে নেমে পড়েন। দীর্ঘ গরমের পর এই আকস্মিক বৃষ্টি রাজধানীবাসীর মনে এনে দিয়েছে প্রশান্তির ছোঁয়া।
গতকাল প্রবল বৃষ্টি শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টির পরশ ছড়িয়ে পড়ে শাহবাগ, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায়। এতে স্বস্তিতে রয়েছেন নগরবাসী। গতকাল পল্টনে কথা হয় ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটা কাজে রামপুরা থেকে এখানে এসেছি। কিন্তু এসেই বৃষ্টিতে আটকা পড়েছি। ততে গরম অনেকটা কমেছে মনে হচ্ছে। কারণ গত কয়েকদিনের গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছিলাম। সামনের দিকে আরো বৃষ্টিপাত হলে আমরা স্বস্তিতে থাকতে পারবো। এভাবেই টানা গরমে অতিষ্ঠ নগরবাসীর মনে গতকাল যেন নেমে আসে স্বস্তির ছোঁয়া। অফিস-আদালত বন্ধ থাকায় রাস্তায় যানবাহনের চাপও ছিল তুলনামূলক কম।