একদিকে আট বছরের শিশু কন্যা ফাতেমাকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে তিন বছর নিখোঁজ থাকার পর মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের ফিরে আসা—বাগেরহাটের খানজাহান আলী (রহ.) মাজার এলাকায় ঘটে যাওয়া এক মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যেই মিলেছে এমন এক আবেগঘন মানবিক গল্প, যা ছুঁয়ে গেছে অনেকের হৃদয়।
খানজাহান আলী (রহ.) মাজার সংলগ্ন দিঘিতে কুমিরের আক্রমণে নিহত শিশু ফাতেমার মা ফজিলা বেগম অবশেষে তার পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। দীর্ঘ তিন বছর নিখোঁজ থাকার পর মেয়ের মৃত্যুর খবরের সূত্র ধরেই তার সন্ধান মেলে।
জানা গেছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরখরিচা গ্রামের বাসিন্দা ফজিলা বেগম প্রায় তিন বছর আগে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর বহু খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। একপর্যায়ে সবাই তাকে মৃত ভেবে নিয়েছিল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফজিলা বেগম প্রায় দুই বছর ধরে খানজাহান আলী (রহ.) মাজার এলাকায় বসবাস করছিলেন। তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে ফাতেমা। মাজার এলাকায় ঘুরে বেড়ানো মা-মেয়েকে স্থানীয়রা প্রায়ই দেখতেন। সামান্য খাবার বা সাহায্য পেলেই তারা একে অপরকে জড়িয়ে থাকতেন।
কিন্তু গত সোমবার রাতে মাজার সংলগ্ন দিঘির মহিলা ঘাটে গোসল করতে নেমে কুমিরের আক্রমণে নিহত হয় শিশু ফাতেমা। পরবর্তীতে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ফজিলার ছবি ও পরিচয় দেখে পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন।
এরপর ময়মনসিংহ থেকে ফজিলার মা হাজেরা খাতুন, ভাই হারেছ আলী, জুয়েল মিয়া ও ছেলে বজলুর রহমানসহ পরিবারের ছয় সদস্য বাগেরহাটে ছুটে আসেন। তারা সেখানে গিয়ে ফজিলাকে শনাক্ত করেন এবং দীর্ঘদিন পর স্বজনকে ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
ফজিলার ভাই জুয়েল মিয়া বলেন, তিন বছর আগে বোন হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পাইনি। আজ বোনকে ফিরে পেয়েছি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। তবে ভাগ্নি ফাতেমাকে হারানোর কষ্ট কখনো ভুলতে পারব না।
বড় ভাই হারেছ আলী বলেন, আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। টেলিভিশন ও ফেসবুকে সংবাদ দেখে বোনকে চিনতে পারি। পরে দ্রুত বাগেরহাটে আসি। বোনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ থাকলেও ঘটনাটি খুবই বেদনাদায়ক।
ফজিলার ছেলে বজলুর রহমান বলেন, তিন বছর ধরে মাকে খুঁজেছি। মাকে ফিরে পেয়েছি, কিন্তু ছোট বোনকে হারিয়েছি। আমরা এখন মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি, কিন্তু বোন আর নেই।
ফজিলার মা হাজেরা খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, মেয়েকে ফিরে পেয়েছি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া। কিন্তু নাতনিটাকে আর পাব না। যদি সেও বেঁচে থাকত, তাহলে আনন্দ পূর্ণ হতো।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফজিলা এখনো মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি পুরোপুরি বুঝতে পারছেন না। তিনি খুব কম কথা বলছেন এবং বারবার বলছেন, আমি আমার মেয়েকে রেখে যাব না।
বাগেরহাট সদর উপজেলা প্রশাসন ফজিলার পরিচয় যাচাই-বাছাই শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তর ও পুলিশের উপস্থিতিতে তাকে পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের পর প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করে ফজিলা বেগমকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”
একদিকে তিন বছর পর মাকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে ছোট্ট ফাতেমাকে হারানোর গভীর শোক—এই দুই বিপরীত অনুভূতি নিয়েই ফজিলার পরিবার এখন বাড়ির পথে। মাজার প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া এই হৃদয়বিদারক ঘটনা স্থানীয়দের মনে দীর্ঘদিন স্মৃতি হয়ে থাকবে।