ফরিদপুরের সালথায় পাট ও পেঁয়াজ চাষই কৃষকদের প্রধান ভরসা, সেখানে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করে আলোচনায় এসেছেন কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামে ৮ বিঘা জমিতে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের আনারসের বাগান গড়ে তুলে তিনি দেখছেন কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ইতোমধ্যে পুরো এলাকায় ব্যাপক কৌতূহল ও আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
মঙ্গলবার (২ জুন) সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও যত্নে গড়ে তোলা বাগানটি দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উৎসুক মানুষ ভিড় করছেন। অনেকেই আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে উদ্যোক্তার কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছেন।
জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষের সঙ্গে যুক্ত মিলন ফকির। গত বছর শখের বসে বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান তিনি। সেখানে সফলতা পাওয়ার পর চলতি বছর বড় পরিসরে বাণিজ্যিক আনারস চাষের উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের চারা সংগ্রহ করে ৮ বিঘা জমিতে রোপণ করেন।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার মোট কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৯৫০ হেক্টর। এর মধ্যে চলতি মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার ৮৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছিল। এছাড়া প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছে। আবাদকৃত জমির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলের কৃষিতে পাট ও পেঁয়াজই প্রধান ফসল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এমন বাস্তবতায় বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের উদ্যোগ স্থানীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, প্রথমে ছাদে আনারস চাষ করে ভালো ফল পাই। এরপর সাহস পেয়ে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করি। চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আগামী বছর ফলন পাওয়া যাবে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি সম্ভব হবে। পাশাপাশি চারা বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে। এতে মোট আয় এক কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে বলে আশা করছি। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা পেলে ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চাষাবাদ সম্প্রসারণ করবো।
স্থানীয় কালাম নামক এক কৃষক বলেন, আমাদের এলাকায় আগে কখনো আনারসের বাণিজ্যিক চাষ দেখিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে ভালো লাগছে। ফলন ভালো হলে আগামী বছর থেকেও আমিও চাষ শুরু করবো।
স্থানীয় আরেক কৃষক বলেন, প্রচলিত পাট ও পেঁয়াজ চাষের বাইরে গিয়ে মিলন ফকিরের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সফল হলে ফরিদপুর অঞ্চলে আনারস চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য সৃষ্টি হবে আয়ের নতুন সুযোগ। বর্তমানে সেই সম্ভাবনাই দেখছেন এলাকার মানুষ।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, সালথায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি ফল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, এ ধরনের লাভজনক ফল চাষের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং কৃষির বহুমুখীকরণ ঘটবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন শিকদার বলেন, কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে ফসলের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। সালথায় প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে আনারস চাষ হওয়ায় আমরা বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছি। বাগানের গাছগুলো বর্তমানে ভালো অবস্থায় রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা অব্যাহত থাকলে আগামী বছর ভালো ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। এ উদ্যোগ সফল হলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আনারস চাষ সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।