কমছেনা হাম ও উপসর্গের প্রাদুর্ভাব, প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রন্তের সংখ্যা। থামছেনা মৃত্যুর মিছিলও। পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তবে হাম শনাক্ত আর শুরুতে অবহেলায় শিশুরা গুরুতর হচ্ছে বলে দাবি চিকিৎসকের।
চিকিৎসকরা জানান, হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেরি হলে জটিলতা বেড়ে মৃত্যুঝুঁঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।
সারাদেশে হামের উপসর্গে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা) আরও দুই শিশু মারা গেছে। এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩৭৭ জন। এর মধ্যে ৫৩ শিশুর হাম শনাক্ত হয়েছিল। হামের উপসর্গ ছিল এক হাজার ৩২৪ শিশুর। হামের উপসর্গে আক্রান্ত দুই শিশু ঢাকা ও বরিশালে মারা গেছে। গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম বিষয়ক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ঈদের ছুটির সময় রাজধানীর বাইরে থেকে আসা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে না এলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। এর ওপর ঈদের ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকা ছাড়ায় সংক্রমণ গ্রামীণ এলাকায় আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের আনন্দের মধ্যেও সন্তানের অসুস্থতা তাদের উদ্বেগে রেখেছে। হামে আক্রান্ত হওয়া সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে দিনের পর দিন কাটাচ্ছে বাবা-মায়েরা। চলছে চিকিৎসা। কিন্তু তবুও অভিভাবকদের মনে থেকেই যাচ্ছে আতংক। কবে সম্পূর্ণ সুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন আছেন সেই অপেক্ষায়। এমন মারাত্মক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো জোরালো প্রচার-প্রচারণা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা সতর্ক করেছেন যে, এই অবহেলা ও উপেক্ষা করার সংস্কৃতি চলমান সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও বেশি নাজুক ও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমীন বলেন, শুধু আক্রান্তের সংখ্যা দেখে প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা মাপা ঠিক হবে না, কারণ সীমিত পরীক্ষা বা নজরদারির দুর্বলতায় আক্রান্তের প্রকৃত হিসাব আড়ালে থাকতে পারে। এক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রবণতাই পরিস্থিতির গতিবিধি বোঝার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক। যা বর্তমানে বাংলাদেশে এখনো স্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করেছে। সংক্রমণ ও মৃত্যু কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পরিস্থিতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।
গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গে ৫৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার অর্থ প্রতি সপ্তাহে গড়ে ৫৭ জনের বেশি শিশু মারা যাচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে সর্বশেষ সপ্তাহেও ৫৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এ সময় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৬ হাজার ৮৮৬ শিশু। তবে এর মধ্যে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৫২ হাজার ৮৪১ শিশু বাড়ি ফিরেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে ৯ হাজার ৪৯ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গতকাল রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইন্সটিটিউটে সরেজমিনে অবস্থান করে দেখা যায়, জরুরী বিভাগের চিকিৎসকদের এবং ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও নার্সদের ব্যস্ততা। একইভাবে দেখা যায় সন্তানকে নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা বাবা-মায়ের পরিশ্রান্ত মলিন চেহারা। আর শোনা যায় শিশুদের কান্নার শব্দ। দেখা যায় হামের ওয়ার্ডে কোন সিট ফাঁকা নেই। একইসাথে কোন কোন রোগীকে সিট ফাঁকা না পেয়ে ফিরে যেতেও দেখা যায়। তারা জানেন না কোথায় যাবেন তারা।
হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বরত নার্স বলেন, আমাদের এখানে সারাক্ষণই রোগী আসতে থাকে। আমার দেখা অনুযায়ী বলতে পারি যে রোগী আগের তুলনায় আসা কমেছে, এটা আমার দেখা অনুযায়ী বলছি। তবে রোগী কমলেও খারাপের অবস্থাটা বেড়েছে।
আগে দেখা যেত যে অনেক রোগী এসেছে আমরা তাদের ইমার্জেন্সিতে দেখে বাসায় ট্রিটমেন্ট করার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। এরকম হয়েছে। কিন্তু এখন যেটা হয়েছে যে এডমিশন লাগেই।
এসময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জরুরী বিভাগে কর্মরত এক চিকিৎসক বলেন, এখন হামের ফ্লো বেড়ে গিয়েছে। এটা ঈদের পরে আরও বাড়বে। কারন তারা বাড়িতে যাবে অনেকের সাথে সংস্পর্শে আসবে। তখন এটা আরও বেড়ে যাবে।
ঈদের ছুটিতে হামের সতর্কতা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী বলেন, ঈদের ছুটিতে বিশাল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হবে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এদের মধ্যে যাদের শরীরে হামের জীবাণু রয়েছে এবং যাদের জ্বর হওয়ার একদিন দুদিন পার হয়েছে তারা কিন্তু অন্যদের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে।
কারণ, হামের ফুসকুরি ওঠার চারদিন আগে এবং চারদিন পর পর্যন্ত এটি জীবাণু ছড়ায় ভাইরাস ছড়ায়। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি ঈদের ছুটির মধ্য দিয়ে হামের ভাইরাস আরো একটু বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। ফলে ঈদের পরে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি আরেকটি সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ কারণে আমরা সবাইকে বলব যাদের পরিবারের কোন একজন অথবা একাধিক কারো জ্বর থাকে তাহলে তাদের উচিত করে অপেক্ষা করা; সেটি হামে রূপান্তরিত হয় কিনা সেটি লক্ষ্য করা এবং একই সাথে চিকিৎসা ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া।