বছরে ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা!

সাইদুল ইসলাম

স্বাস্থ্য

চলছে বর্ষা মৌসুম। এ মৌসুম আসলেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু আতঙ্কে থাকছেন সাধারণ মানুষ। যদিও প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর

2026-07-21T12:49:35+00:00
2026-07-21T13:55:27+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
স্বাস্থ্য
কমছে না ডেঙ্গুতে মৃত্যু-আক্রান্ত
বছরে ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা!
সাইদুল ইসলাম
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম  আপডেট: ২১.০৭.২০২৬ ১:৫৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
চলছে বর্ষা মৌসুম। এ মৌসুম আসলেই রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু আতঙ্কে থাকছেন সাধারণ মানুষ। যদিও প্রতিদিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। সরকারি হিসেবে গতকাল সোমবারও ঢাকাসহ সারাদেশে তিনজনের মুত্যু হয়েছে। আর আক্রান্ত হয়েছেন ৩৭২ জন। সব মিলয়ে চলতি বছর ১০ হাজার ৮৫৭ জন মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। 

মশা নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুব একটা কাজে না আশায় প্রতি বছর এভাবে মুত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। একই সাথে ডেঙ্গু আক্রান্তদের দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতা, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘ্ন হচ্ছে। 

এসব বিষয় বিবেচনায় ডেঙ্গুর কারণে বছরে দেশের ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির দিকে এগুনোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

শুধু মাঝে মধ্যে কীটনাশক স্প্রে করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে জানিয়েনে বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ লার্ভা দীর্ঘ সময় শুকনো অবস্থায় টিকে থাকতে পারে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই দ্রুত আবার মশায় পরিণত হয়। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার জীবনচক্র ভাঙ্গতে হবে। কারণ ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ হওয়ায় সব রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয় না। 

তবে জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যশিক্ষা, জলাশয় ও লার্ভা ধ্বংস এবং স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের, বিশেষ করে অনিবন্ধিত স্বাস্থ্যকর্মীদের সচেতনতার আওতায় আনতে হবে। এই তিনটি বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু, আক্রান্তের সংখ্যা এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় এর সাথে জড়িতদের উপর ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, ঢাকার বাহিরে মশা নিধনের সাথে জড়িত কর্তৃপক্ষ তেমন কোন কাজ না করায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যু ব্যাপক হারে বাড়ছে। 

তবে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন সকাল-বিকাল দ্বিগুণ হারে কীটনাশক প্রয়োগসহ নানা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন। পাশাপাশি জনসচেতনতার উপর জোর দেয়া হয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রণে যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুব একটা কাজে না আসায় এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। ফলে দুই সিটি করপোরেশনের মশক বিভাগকে ঢেলে সাজানোসহ বিকল্প ব্যাবস্থা গ্রহণের তাগিদ দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলছেন, এডিস মশা যেখানে হয় সেখানে টার্গেট করে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে। যেখানে হয়তো আমরা পারছি না, কেন পারছি না সেটা বের করতে হবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঢাকা নয় উপজেলাতেও মশা ছড়িয়ে পড়েছে। কেন উপজেলাতে ডেঙ্গু হচ্ছে। তা খুঁজে বের করতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা করার বিকল্প নেই। এ বিষয়ে রাষ্ট্রকে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে। না হয় প্রতিদিনই আক্রান্ত ও মুত্যুর ঘটনা ঘটতেই থাকবে।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, একই সময়ে ৩৭২ জন আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 

ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১৭৭ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ২১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৫৪ জন, খুলনা বিভাগে ৪৩ জন, রাজশাহী বিভাগে চার জন, রংপুর বিভাগে ছয় জন, বরিশালে বিভাগে ৬৭ জন রয়েছেন। চলতি বছরের গতকাল পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১০ হাজার ৮৫৭ জন। ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে মোট ৩৭ জনের। 

চলতি বছরে এ যাবত মোট নয় হাজার ৭৮৬ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে এক হাজার ৩৪ জন চিকিৎসাধীন আছেন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে জানিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। এর আগে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়। 

২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। 

২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়, পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। এভাবে প্রতি বছরই ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এর সাথে জড়িতদের তেমন একটা মাথা ব্যাথা নেই। 

জানা যায়, প্রতি বর্ষা মৌসুমে মূলত রাজধানীতে এডিস মশার উপদ্রব দেখা দেয়ার কথা থাকলেও গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা না থাকলেও ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এতে প্রতি নিয়ত আতঙ্কে থাকছে নগরবাসী। তবে এর জন্য উত্তর ও দক্ষিণ সিটির পক্ষ থেকে নগরবাসীকেই দোষারোপ করা হচ্ছে। 

কারণ নগরীর বাসা, অফিস আদালতের জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতেই এডিস মশার জন্ম হচ্ছে। ফলে দুই সিটি থেকে বারবার বলা হচ্ছে যার যার ঘর, বাড়ি, অফিস, আদালতে তিন দিনের বেশি যেন কোন পানি জমে না থাকে।

কিন্তু এ বিষয়ে কর্ণপাত না করায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে বলে মনে করছে দুই সিটি। এক্ষেত্রে নাগরিকদের দুই সিটির পাশাপাশি সচেতন হতে হবে। না হয় বছরজুড়েই ডেঙ্গুর বিস্তার অব্যাহত থাকবে। 

বর্তমানে মশা নিয়ন্ত্রণে যেসব কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুব একটা কাজে আসছে না বলে  খোদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। 

সোমবার (২০ জুলাই) রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে ইয়ুথ টু ওয়ার্ল্ড আয়োজিত মশা নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি শীর্ষক অনুষ্ঠানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে তিনি এ কথা বলেন। 

মন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া বিস্তারের বর্তমান মৌসুমে মশার লার্ভা নিধন করা প্রধান কাজ। এক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার করা গেলে মশা নিধনে সিটি কর্পোরেশন এবং উদ্ভাবকদের যৌথ কর্মসূচি সফল হবে। 

মশক নিধনে যে সমস্ত প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো উপযুক্ত কাজ করতে পারছে না উল্লেখ করে মন্ত্রী আরো বলেন, দেশীয় রাসায়নিক ব্যবহার করে তৈরি যে প্রযুক্তি নিয়ে কথা হচ্ছে, সেটি সম্ভাবনাময়। এ বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। 

এদিকে, দেশে ডেঙ্গুর সরকারি পরিসংখ্যান প্রকৃত পরিস্থিতির পুরো চিত্র তুলে ধরে না বলে জানিয়েছেন, যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেম উদ্দিন ফরিদ। তিনি বলেন, দেশে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং ২৭ শতাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল বা স্বীকৃত চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নেন। 

বাকি ৬০ শতাংশ মানুষ অনিবন্ধিত ও অনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবাদাতাদের কাছ থেকে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে খুব কমই আসে। এ কারণে ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সরকারি হিসাব হচ্ছে ‘টিপ অব দ্য আইসবার্গ’। 

ডা. মোসলেম উদ্দিন জানান, সরকারি হিসাবে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫০০ মানুষ ডেঙ্গুতে মারা যান এবং ১ লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এখনও অনেকের মধ্যে মশারি ব্যবহার করলেই ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব এমন ভুল ধারণা রয়েছে। অথচ এডিস মশা দিনের বেলায় কামড়ায়। 

তাই দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ফুলের টব, নির্মাণাধীন ভবন, রাস্তার পাশের গর্তসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণে গুরুত্ব দিতে হবে। কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, ডেঙ্গু থেকে মানুষকে রক্ষায় একটি জাতীয় পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। 
জাতীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশে এডিস রোগ নিয়ন্ত্রণে কী কী করা যায় বিশ্লেষণ করে সব স্টেকহোল্ডারকে সঙ্গে নিয়ে একটি জাতীয় পরিকল্পনা করতে হবে। 

এছাড়া, মশা জন্মানোর তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যারা এর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন তারা টার্গেট করে মশা নিধন করতে হবে। এডিস মশা যেখানে হয় সেখানে টার্গেট করে তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু যেটা হচ্ছে না।  কেন হচ্ছে না সেটা বের করতে হবে। না হয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।


  বিষয়:   রাজধানী  ডেঙ্গু  মশা নিয়ন্ত্রণ 


Loading...
Loading...

স্বাস্থ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: