আর্সেনালের আশা বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন ছিল গোল। কিন্তু টাইব্রেকারে গতিময় শট লক্ষ্যেই রাখতে পারলেন না গাব্রিয়েল। ক্রসবারের ওপর দিয়ে ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডারের শট গেল গ্যালারিতে। শিরোপা উৎসবে মেতে উঠল পিএসজি। হতাশায় নুয়ে পড়ল আর্সেনাল।
বুদাপেস্টে শনিবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছে পিএসজি। ইউরোপ সেরার মঞ্চে লুইস এনরিকের দলের এটি টানা দ্বিতীয় শিরোপা।
টাইব্রেকারে পিএসজির প্রথম দুটি শট এবং আর্সেনালের প্রথমটি ঠিকানা খুঁজে পাওয়ার পর, প্রথম ভুলটা করেন এবেরেচি এজে, দুর্বল শট মারেন বাইরে। আর্সেনাল শিবিরে তখন পিনপতন নীরবতা, তাদের গ্যালারিতেও তাই।
তবে, পরক্ষণেই দাভিদ রায়ার অসাধারণ নৈপুণ্যে জেগে ওঠে আর্সেনাল সমর্থকরা, নুনো মেন্দেসের শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে ঠেকিয়ে দেন স্প্যানিশ গোলরক্ষক। এরপর, দুই দলেরই পরের দুটি করে শট জালে জড়ায়। শেষ শটটি নিতে আসেন প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়নদের ডিফেন্ডার গাব্রিয়েল; প্রবল চাপের মুহূর্তে শট লক্ষ্যেই রাখতে পারেননি তিনি, উড়িয়ে মারেন আকাশে!
তাতে আরও একবার আর্সেনালের ইউরোপ সেরা হওয়ার স্বপ্নটাও উড়ে যায়।
এর আগে ম্যাচের শুরুতে আর্সেনালকে এগিয়ে নেন কাই হাভার্টজ। দ্বিতীয়ার্ধে সফল ম্পট কিকে সমতা ফেরান উসমান দেম্বেলে। মূল ম্যাচ শেষ হয় ১-১ সমতায়। পরে অতিরিক্ত সময়েও একই থাকে স্কোর লাইন।
৭৫ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখে গোলের জন্য ২১টি শট নেয় পিএসজি। ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা লক্ষ্যে রাখতে পারে চারটি শট। অন্যদিকে, আর্সেনাল সাত শটের কেবল একটি লক্ষ্যে রাখতে পারে। যেটি ছিল ম্যাচে তাদের প্রথম শট।
হাভার্টজের নৈপুণ্যে ষষ্ঠ মিনিটেই এগিয়ে যায় আর্সেনাল। মাঝমাঠের একটু সামনে কিছুটা সৌভাগ্যের ছোঁয়ায় ফাঁকায় বল পেয়ে যান হাভার্টজ। বিনা বাধায় এক ছুটে ডি-বক্সে ঢুকে দুরূহ কোণ থেকে জোরাল শটে দলকে এগিয়ে নেন জার্মান তারকা।
২০২০-২১ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে হাভার্টজের একমাত্র গোলেই ম্যানচেস্টার সিটিকে হারিয়ে শিরোপা উৎসব করেছিল চেলসি। জার্মানির তৃতীয় খেলোয়াড় হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের একাধিক ফাইনালে গোল করলেন তিনি।
বল পায়ে না থাকা অবস্থায় বেশ সুশৃঙ্খল ও সংগঠিত ছিল আর্সেনাল। প্রয়োজনের সময় আউটফিল্ডের ১০ জন খেলোয়াড়ই ছিলেন নিজেদের গোলের ৩০ গজের মধ্যে।
তবে, এগিয়ে যাওয়ার পর বল দখলে রাখতে পারছিল না তারা। বরং পজেশন রেখে আক্রমণ করতে থাকে পিএসজি, কিন্তু আর্সেনালের জমাট রক্ষণের সামনে সুবিধা করতে পারছিল না তারা।
আগের পাঁচ ম্যাচে কেবল একবার গোল হজম করা আর্সেনাল এগিয়ে যাওয়ার পর, রক্ষণ সামলে প্রতি-আক্রমণ নির্ভর ফুটবল খেলতে থাকে।
৪১তম মিনিটে নুনো মেন্দেসের কাটব্যাক বিপদমুক্ত করতে গিয়ে বিপদ প্রায় ডেকে এনেছিলেন পিয়েরো ইনকাপিয়া। তার পায়ে লেগে আসা বলে ঠিকঠাক হেড করতে পারেননি অরক্ষিত ফাবিয়ান রুইস। বল যায় ক্রসবারের ওপর দিয়ে।
যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে দুর্দান্ত স্লাইডে হাভার্টজের শট প্রতিহত করেন পিএসজি অধিনায়ক মার্কিনিয়োস।
প্রায় একই তালে শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধ। ৫৫তম মিনিটে বিপজ্জনক জায়গায় ফ্রি কিক পায় পিএসজি। হাকিমি শট নেন গোলরক্ষক রায়া বরাবর।
৬৫তম মিনিটে সফল স্পট কিকে ম্যাচে সমতা ফেরান দেম্বেলে। বাম দিকে ডাইভ দেন রায়া, ফরাসি ফরোয়ার্ড শট নেন ডান দিকের পোস্ট ঘেঁষে। ২০১৮ আসরের ফাইনালের পর এই প্রথম ফাইনালে জালের দেখা পেল দুই দল।
খাভিচা কাভারাৎস্খেলিয়াকে ডিফেন্ডার ক্রিস্তিয়ান মসকেরা ফাউল করায় পেনাল্টিটি পায় পিএসজি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে সময় নষ্ট করার জন্য হলুদ কার্ড দেখা মসকেরার ভাগ্য ভালো, এই যাত্রায় তাকে কার্ড দেখাননি রেফারি।
৭৯তম মিনিটে একটুর জন্য জালের দেখা পাননি কাভারাৎস্খেলিয়া। প্রতি আক্রমণে নিজেদের অর্ধে বল পেয়ে, উইলিয়াম সালিবাকে পরাস্ত করে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যান এই উইঙ্গার। ডি-বক্স থেকে তার জোরাল শট বেরিয়ে যায় পোস্টে লেগে!
৮৩তম মিনিটে কাভারাৎস্খেলিয়ার জায়গায় বদলি নামেন ব্রাডলি বারকোলা। দুই মিনিটের মধ্যেই গোল পেয়ে যাচ্ছিলেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড। তবে পোস্ট ছেড়ে বেরিয়ে এসে কোনোমতে বল নিয়ন্ত্রণে নেন আর্সেনাল গোলরক্ষক রায়া।
ছয় মিনিট পর ভিতিনিয়ার শট যায় ক্রসবারের একটু ওপর দিয়ে। নষ্ট হয় পিএসজির দারুণ সুযোগ।
যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে সুযোগ পান বারকোলা। কিন্তু দুরূহ কোণ থেকে শট লক্ষ্যে রাখতে পারেননি তিনি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে গোলের তেমন নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করতে পারেনি কোনো দলই। এই অর্ধের শেষ দিকে পেনাল্টির জোরাল দাবি তোলে আর্সেনাল। বলের দখল নিয়ে মেন্দেসের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে যান ননি মাদুয়েকে।
পেনাল্টির দাবিতে সাড়া দেননি রেফারি। বারবার তার কাছে আবেদন জানিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন আর্সেনাল মিডফিল্ডার রাইস। ডাগআউটে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখানো কোচ আর্তেতাও দেখেন হলুদ কার্ড। পরে ভিএআর পরীক্ষা করে রেফারির সিদ্ধাই বহাল রাখে।
দ্বিতীয়ার্ধে খেলার গতি একটু বাড়ে। গোলের সুযোগও তৈরি করে পিএসজি। কিন্তু রায়াকে পরাস্ত করতে পারেননি ফরাসি চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে।
কদিন আগে ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে শিরোপা জেতে আর্সেনাল। সেখানে খরা কাটাতে পারলেও, ইউরোপ সেরার মঞ্চে শিরোপা অধরাই রয়ে গেল তাদের।
এক সময়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের জন্য মরিয়া ছিল পিএসজি। তাদের দীর্ঘ চেষ্টার সফল সমাপ্তি হয় গত মৌসুমে, এবার শিরোপা ধরে রাখল এনরিকের ছোঁয়ায় বদলে যাওয়া দলটি।