রাজধানীরসহ দেশের শিশু হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে এখন প্রায় প্রতিদিনই একই দৃশ্য কোলে জ্বর আর শ্বাসকষ্টে কাতর শিশু, পাশে উৎকণ্ঠিত মা-বাবা। কারও ঠোঁট নীলচে হয়ে গেছে, কেউ আবার অক্সিজেন ছাড়া শ্বাসই নিতে পারছে না। চিকিৎসকেরা বলছেন, হামের প্রকোপ কিছুটা কমতে শুরু করলেও এখন নতুন করে ভয়াবহ উদ্বেগ তৈরি করেছে নিউমোনিয়া। বিশেষ করে হাম-পরবর্তী জটিলতা হিসেবে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়ার সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে। আর নীরবে বাড়ছে শিশুমৃত্যু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসে হাম-পরবর্তী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ময়মনসিংহ, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট বিভাগের শিশু ওয়ার্ডগুলোতে চাপ বেড়েছে কয়েক গুণ। কোথাও কোথাও বেড সংকট এতটাই তীব্র যে শিশুদের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য, হাম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। ফলে হাম থেকে সেরে ওঠার পরও শিশুরা সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হচ্ছে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, বর্তমানে যে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, তার বড় অংশই নিউমোনিয়াজনিত জটিলতার কারণে। অনেক অভিভাবক প্রথমে সাধারণ সর্দি-কাশি ভেবে অবহেলা করেন। পরে শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তখন অনেক সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
হাম কমলেও বাড়ছে জটিলতা : দেশে চলতি বছর মার্চ থেকে হামের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে হাম-পরবর্তী জটিলতা। বিশেষ করে নিউমোনিয়া। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. জিয়াউল হক বলেন, হাম একটি ভাইরাসজনিত রোগ। টিকাদান কর্মসূচির কারণে একসময় এটি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু গত দুই বছরে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় আবার সংক্রমণ বাড়ছে। তিনি জানান, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে পর্যন্ত দুই মাসে ৫৪ হাজার ৪১৯ জনের মধ্যে হাম ও হাম সদৃশ উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ জনের হামে মৃত্যু হয়েছে এবং ৩৬৯ জন মারা গেছে হাম সদৃশ উপসর্গ নিয়ে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সরাসরি হামের চেয়ে নিউমোনিয়াই এখন বড় ঘাতক। কারণ হাম থেকে সেরে ওঠা দুর্বল শিশুদের শরীরে দ্রুত ফুসফুসের সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে গত কয়েক সপ্তাহে একের পর এক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, অধিকাংশ শিশুই তীব্র শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় ভুগছিল।
বছরে ২৪ হাজার শিশুর মৃত্যু : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞদের তথ্য বলছে, দেশে বছরে প্রায় ২৪ হাজার শিশু নিউমোনিয়ায় মারা যায়। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ৬০ থেকে ৭০ জন শিশু এ রোগে প্রাণ হারাচ্ছে। অথচ এই মৃত্যু নিয়ে জনপরিসরে আলোচনা তুলনামূলক কম। এ বিষয়ে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসায় দেরি হলে জটিলতা বাড়ে। হাম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তখন শিশুরা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রমণে আক্রান্ত হয়। তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশু সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু নিউমোনিয়া জটিল আকার নিলে মৃত্যুঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।
টিকাদানে ঘাটতি ও অপুষ্টি বড় কারণ : স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে হামের বিস্তারের অন্যতম কারণ টিকাদানে ঘাটতি। অনেক শিশু সময়মতো এমআর (মিজেলস-রুবেলা) টিকা পায়নি। করোনাকালে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়ে লাখো শিশু। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে প্রায় দুই কোটি শিশু হাম সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। আক্রান্তদের বড় অংশই টিকাবঞ্চিত অথবা আংশিক টিকা নেওয়া শিশু। চট্টগ্রাম বিভাগের কয়েকটি পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় টিকাদান কাভারেজ তুলনামূলক কম। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, এসব এলাকায় এখন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপুষ্টিও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। যেসব শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না, তাদের শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে পারে না। ফলে নিউমোনিয়া দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
সম্প্রতি অধ্যাপক ডা. রুহুল আমিন বলেন, দেশে এখন ব্রেস্ট ফিডিংয়ের হার ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু মাতৃদুগ্ধের বাইরে থাকছে। এতে তাদের রোগপ্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি প্যাকেটজাত খাবারের ওপর নির্ভরশীলতাও শিশুদের দুর্বল করে দিচ্ছে।
হাসপাতালজুড়ে অক্সিজেন ও আইসিইউ সংকট : শিশু হাসপাতালগুলোতে এখন সবচেয়ে বড় সংকট অক্সিজেন ও আইসিইউ সুবিধা নিয়ে। অনেক সরকারি হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র নেই। ফলে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। চিকিৎসকেরা বলছেন, সময়মতো অক্সিজেন ও নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হতো।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যৌথভাবে ‘বাবল সিপ্যাপ’ প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত অক্সিজেন সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কী লক্ষণে সতর্ক হবেন : চিকিৎসকদের মতে, অনেক পরিবার এখনও হাম ও নিউমোনিয়াকে সাধারণ অসুখ হিসেবে দেখছে। ফলে প্রাথমিক লক্ষণ উপেক্ষিত হচ্ছে। শিশুর দ্রুত শ্বাস নেওয়া, বুক দেবে যাওয়া, ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া, খেতে না চাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঝিমিয়ে পড়া, এসব নিউমোনিয়ার বিপজ্জনক লক্ষণ। এমন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিউমোনিয়া প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা, শিশুকে জন্মের পরপর বুকের দুধ খাওয়ানো, অপুষ্টি প্রতিরোধ এবং ধূমপানের ধোঁয়া থেকে দূরে রাখা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ। গ্রামাঞ্চলে টিকাদান জোরদার, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অক্সিজেন সুবিধা বাড়ানো এবং কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। সরকার ইতোমধ্যে হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইনও চালানো হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সাময়িক ক্যাম্পেইন নয়, দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি ও টিকাব্যবস্থার দুর্বলতা কাটাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ চিকিৎসকদের ভাষায়, হাম হয়তো শুরু, কিন্তু শেষ আঘাতটা দিচ্ছে নিউমোনিয়া।