একসময় টিকাদানে সাফল্যের জন্য বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল বাংলাদেশ। হাম প্রায় নিয়ন্ত্রণেই চলে এসেছিল। কিন্তু মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেই অর্জন এখন বড় সংকটে। দেশের হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিনই বাড়ছে জ্বর, শরীরে র্যাশ ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা। প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে নতুন মৃত্যু।
বুধবার (২২ জুলািই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ বুলেটিনে জানানো হয় ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে ১৫ মার্চ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত হামে ও হামের জটিলতায় মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৮০৩ জনে পৌঁছেছে।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ নজরদারি তথ্য বলছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত ছয় মাসে বিশ্বে হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগী সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশে। একসময় যে দেশ হাম নির্মূলের পথে অগ্রগতির উদাহরণ ছিল, সেই বাংলাদেশ এখন বিশ্বে সবচেয়ে বড় হাম সংকটের দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২০ হাজার ৩৫২ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৮৪১ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
এ সময় ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসা শেষে ৯৯ হাজার ২৯৪ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে ৩ হাজার ৭৮৪ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ডব্লিউএইচওর জেনেভা সদর দপ্তরে জমা হওয়া বৈশ্বিক নজরদারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বাংলাদেশে ৪২ হাজার ১৭৪ জন হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছেন। এই সময়ে বিশ্বের কোনো দেশেই এত রোগী পাওয়া যায়নি।
এই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত (২৬ হাজার ৬০৭)। এরপর রয়েছে ইয়েমেন (১৪ হাজার ৫২১), মেক্সিকো (১২ হাজার ৪৯৫), পাকিস্তান (১১ হাজার ৩৭), ক্যামেরুন (৯ হাজার ৬৫৩), কাজাখস্তান (৭ হাজার ৭৩০), গুয়েতেমালা (৬ হাজার ৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬ হাজার ৮১৫) এবং সুদান (৫ হাজার ৭৬৬)।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ওই ছয় মাসে বিশ্বের ১৬৫টি দেশে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বড় সংক্রমণ সংকট এখন দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।
বাংলাদেশে কয়েক বছর আগেও হামের প্রকোপ ছিল খুবই কম। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৩১১ জন, ২০২৩ সালে ২৮২ জন, ২০২৪ সালে ২৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে মাত্র ১৩২ জন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু চলতি বছর মার্চ থেকে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। মার্চে প্রায় ৫ হাজার রোগী শনাক্ত হওয়ার পর এপ্রিলে সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মে মাসেও ১৫ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়।
ডব্লিউএইচওর জুলাই মাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। এক বছরের কম বয়সী প্রায় পাঁচ হাজার আক্রান্ত শিশুর মধ্যে চার হাজারের বেশি কোনো শিশু হামের টিকা পায়নি। এক থেকে চার বছর বয়সী আক্রান্ত শিশুদের মধ্যেও বড় একটি অংশ টিকার আওতার বাইরে ছিল।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুদের প্রায় ৮০ শতাংশই টিকা পায়নি। আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কয়েক বছর ধরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ কমে যাওয়াই বর্তমান সংকটের মূল কারণ। একসময় জাতীয় হাম টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় শতভাগ শিশু টিকার আওতায় এলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিয়মিত হাম টিকাদানের কভারেজ ৫৯ শতাংশে নেমে আসে, যেখানে হার্ড ইমিউনিটি নিশ্চিত করতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুর দুই ডোজ টিকা পাওয়া প্রয়োজন।
এপ্রিল মাসে সরকার ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেও হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৬ লাখ শিশু ওই কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ : জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, বাংলাদেশ এবার হাম সংক্রমণে বিশ্বে শীর্ষে থাকবে- এটি প্রায় নিশ্চিত। তার ভাষায়, শুধু সংক্রমণ নয়, হামে মৃত্যুর সংখ্যাও বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, টানা কয়েক বছর প্রয়োজনীয় টিকাদান কভারেজ না থাকায় দেশে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়েছে। দ্রুত সেই ঘাটতি পূরণ করা না গেলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত টিকার বাইরে থাকা শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত চিকিৎসা, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত এবং সারাদেশে নিবিড় রোগ নজরদারি চালিয়ে যেতে হবে।
তাদের মতে, তা না হলে চলমান এই প্রাদুর্ভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং শিশুমৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।