বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বছিলা ব্রিজ এলাকায় স্ত্রী ফাতেমা গুলিতে নিহত হয়েছেন—এমন অভিযোগ এনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিলেন মো. সুমন নামে এক ব্যক্তি। তবে তদন্তে পুলিশ বলছে, এমন কোনও হত্যাকাণ্ড ঘটেনি; এমনকি ভুক্তভোগীর অস্তিত্বও মেলেনি।
তদন্ত শেষে মামলার সব আসামির অব্যাহতির সুপারিশ করে বাদী সুমনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে প্রসিকিউশনের আবেদন করা হয়েছে।
গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন সুমন। তিনি নিজেকে নিহত ফাতেমার স্বামী দাবি করেন। আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার জন্য মোহাম্মদপুর থানাকে নির্দেশ দেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বছিলা ব্রিজ এলাকায় বুকে গুলি লেগে ফাতেমা নিহত হন।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, হারুন-অর-রশীদ ও বিপ্লব কুমার বিশ্বাস।
এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে রয়েছেন কামরুল ইসলাম, এটি নিজাম উদ্দিন, রফিকুল ইসলাম, রাসেল মিয়া, সৈকত ইসলাম কামরুল, আব্দুল মুকিত মজুমদার ও বিল্লাল ওরফে ভাতিজা বিল্লাল। তাদের মধ্যে বিল্লাল জামিনে আছেন, অন্যরা কারাগারে রয়েছেন।
তদন্ত শেষে গত ২৭ এপ্রিল আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেন মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শাহাদাত হোসেন। প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, তদন্তে অভিযোগের কোনও সত্যতা পাওয়া যায়নি।
মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জামসেদ আলম আগামী ২৪ জুন দিন ধার্য করেছেন বলে জানিয়েছেন পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাদী সুমনের কাছে বিভিন্ন কাগজপত্র চাওয়া হলেও তিনি কোনও নথি দিতে পারেননি। তিনি দাবি করেছিলেন, ফাতেমাকে আশুলিয়ার ইয়ারপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তবে কবরস্থান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত কোনও ব্যক্তিকে দাফন করা হয়নি।
এ ছাড়া ফাতেমার হাসপাতালে ভর্তি, মৃত্যু বা দাফনসংক্রান্ত কোনও তথ্য-প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, মোহাম্মদপুর এলাকায় আন্দোলনে নিহত ২৩ জনের সবাই পুরুষ; কোনও নারীর মৃত্যুর তথ্য নেই।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সুমন স্বীকার করেন, তিনি ফাতেমা নামে কাউকে চিনতেন না। এমনকি ওই নামে কেউ নিহত হয়েছেন কি না, সেটিও তার জানা ছিল না। তিনি আরও বলেন, কিছু ব্যক্তির প্ররোচনা ও আর্থিক প্রলোভনে পড়ে তিনি মামলার বাদী হতে রাজি হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সুমন পরে বুঝতে পারেন যে তিনি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন। এরপর তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং মামলার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। পরবর্তীতে তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
ফাতেমা নামে কোনও ভুক্তভোগীর অস্তিত্ব না পাওয়া এবং অভিযোগে বর্ণিত সময়-স্থান অনুযায়ী অপরাধ সংঘটনের প্রমাণ না মেলায় তদন্ত কর্মকর্তা সব আসামির অব্যাহতির সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।
আসামি বিল্লালের আইনজীবী মোস্তফা আল মামুন বলেন, ‘এ ধরনের মামলা এখন অনেক হচ্ছে। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে এমন মামলা দেওয়া হয়। অযথা কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটাই আমরা চাই।’
এ বিষয়ে বাদী সুমনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।