রাজধানী ঢাকায় টানা বৃষ্টিপাতে ভোগান্তি হয় এটা এখন স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু গতকাল সোমবার রাজধানীতে সামান্য বৃষ্টিপাতেও বিভিন্ন স্থানে জলজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে সব শ্রেণী পেশার মানুষ চরম বিপাকে পড়েন। বর্ষার মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় এ দুর্ভোগ আরো কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে দুই সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বশীলরা আশার বাণী শুনালেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ফলে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি চরম ক্ষুব্ধ নগরবাসী। এসব থেকে বাঁচার জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিন দেখা যায়, রাজধানীর প্রগতি সরণি, বিমানবন্দর সড়কের নিকুঞ্জ এলাকা, মিরপুর এলাকা, মিরপুর ১০ নম্বর মেট্রো স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকার সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে জলাবদ্ধায় মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার সড়কে পানির কারণে দীর্ঘ সময় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
নগরীরর বিভিন্ন সড়ক পাড়া মহল্লা ঘুরে আরো দেখা গেছে, টানা বৃষ্টি হলেই রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধালণ মানুষকে। কিন্তু বর্ষায় দুই সিটির সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় এ দুর্ভোগ আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে রাজধানীর রামপুরা হাজিপাড়া থেকে হাতিরঝিলগামী সড়কটি গত আট মাস ধরে ঢাকা ওয়াসার কাজের উন্নয়নে খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়েছে। এখনো এই সড়কটিতে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে, হাতিরঝিল মিরবাগ মোড় থেকে মীরেরটেকগামী সড়কটি উত্তর সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজ শুরু হয়েছে কয়েকসপ্তাহ আগে। কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির পর সাথে সাথে সড়কটি সংস্কার কাজ না করায় পায়ে হেটেও চলাচল করতে পারছে না এলাকাবাসী। এছাড়া অনেকদিন ধরে দোকানটাও বন্ধ রয়েছে। এতে স্থানীয়রা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন সড়কটি দিয়ে হাজারো মানুষ বিভিন্ন স্থানে চলাচল করেন। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে খোঁড়াখুঁড়ি করায় চলাচল করা যাচ্ছে না। এমনকি এলাকার ব্যবসা বাণিজ্যও বন্ধ রয়েছে। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে এ বিষয়ে উত্তর সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে বর্ষায় সড়কটিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় ড্রেনের উন্নয়ন কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে দ্রুত সংস্কার করা হবে।
নগরবাসীর মতে, ঢাকার জন্মের পর থেকেই বিভিন্ন সড়ক এভাবে খোঁড়াখুঁড়ি যে চলছে তা আর বন্ধ হচ্ছে না। যখন যে সংস্থার ইচ্ছে হয় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করছে। এ বিষয়ে সুর্নিদিষ্ট নীতিমালা থাকলেও তার বাস্তবায়ন না থাকায় বছরজুড়ে চলে খোঁড়াখুঁড়ি। এখন বর্ষা মৌসুম চলছে। এসময়ও গুরুত্বপূর্ন অনেক সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি করছে বিভিন্ন সেবাদানকারি প্রতিষ্ঠান। বৃষ্টি হলে এসব সড়কে হেটেও চলাচল করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে দেখেও না দেখার ভান করছে সংশ্লিষ্টরা। ঢাকায় কখনও মুষলধারে আবার কখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে পানি জমে চরম দুর্ভোগে থাকা নগরবাসীর মতে, ঢাকায় টানা বৃষ্টি হলে বাসা থেকে বের হওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। তারমধ্যে অনেক সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় অনেক ভোগান্তি হচ্ছে। তারা বলছে, খোঁড়াখুঁড়ি ও উন্নয়ন কাজগুলো বর্ষার আগে বা পড়ে করলে এ ধরনের ভোগান্তি থাকে না। এ বিষয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। মিরপুর-১২ এলাকার বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর ধরে দেখে আসছি। একটু বৃষ্টি হলেই রাস্তায় পানি জমে, জলাবদ্ধতা হয়। সিটি করপোরেশন থেকে বার বার প্রতিশ্রুতি আসে, কিন্তু কাজ হয় না। একটু বৃষ্টি হলেই ছোট বাচ্চাদের নিয়ে স্কুলে যাওয়ার-আসার সমস্যা হয়। যদিও সিটি করপোরেশনের লোকজন পরে এসে পানির সরানো ব্যবস্থা করে। তবুও ভোগান্তিতে পড়তে হয় আমাদের।
আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির জানিয়েছেন, গতকাল সোমবার বেলা ১২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত ঢাকায় ২৩ মিলিমিটার বৃষ্টি ঝরেছে। গতকাল সকালে ঢাকায় রোদের দেখা মিললেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে মেঘ করতে শুরু করে। এরপর দুপুরবেলা বৃষ্টি হয়। তাতে পথচারী, হকার, দোকানি আর চাকরিজীবীরা পড়েন ভোগান্তিতে। অস্থায়ী দোকান আর বহুতল ভবনের নীচে আশ্রয় নেন অনেকে। বৃষ্টিতে ভিজেই আবার চলাচল করতে দেখা যায় অনেককে। এর মধ্যে ঢাকার বেশ কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে গাড়ি চলাচলে ধীরগতির ফলে কোথাও কোথাও তীব্র যানজটেরও সৃষ্টি হয়েছে।
নগরবাসী বলছেন, গরমের মধ্যে একটু বৃষ্টির আশা সবাই করছে। কিন্তু ঢাকার বাসিন্দাদের জন্য বৃষ্টি যেনো দিন দিন কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধার কবলে পড়তে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক কাজ কর্মে চরম বিঘ্ন ঘটে। আর জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলেও কিছুতেই জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না ঢাকাবাসীকে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের ম্যানহোলগুলোতে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা এবং ড্রেনগুলোর পানি ধারণ ক্ষমতার স্বল্পতার কারণে বৃষ্টি হলে জলাবব্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নগরবাসী। মিরপুরের বাসিন্দা আমিনুল হক বলেন, আমরা নিয়মিত সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স পরিশোধ করি। কিন্তু সেই তুলনায় যথাযথ সেবা পাচ্ছি ন। বর্ষায় এভাবে আর কতদিন জলাবদ্ধতার কবলে আমাদের পড়তে হবে জানিনা। আমরা যে কোনো মূল্যে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চাই। উত্তর সিটির সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, নগরীতে বৃষ্টি হলে আগেরমত এখন আর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় না। তবে কিছু কিছু এলাকায় হলেও তা দ্রুত নিরসন হয়ে যাচ্ছে। পুরোপুরিভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে আর জলাবদ্ধতা থাকবে না।
স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। বিশেষ করে বর্ষায় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ করতে হবে। না হয় জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী রক্ষা পাবে না।