
বাংলাদেশের ক্রিকেটে বর্তমানে তারুণ্যের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। সময়ের পরিক্রমায় দল পুনর্গঠনের নতুন অধ্যায় চলছে। একটা সময় সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ-মাশরাফির নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি শক্ত অবস্থানে ছিল। তাদের দেখে অনেক উদীয়মান খেলোয়াড় উঠে আসছে এবং সমীহ জাগানোর মতন মনমানসিকতা তৈরি করার পিছনে এদের একটি বিশেষ অবদান ছিল। টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টি বা ওয়ানডেতে বাংলাদেশকে একটি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে গড়ার স্বপ্ন তারাই দেখেছিল। কিন্তু টেস্ট কিংবা টি-টোয়েন্টিতে আশানুরূপভাবে শক্ত অবস্থানে নিতে না পারলেও অন্তত চোখে চোখ রেখে লড়াই করার মন মানসিকতা গড়ে উঠেছিলো। অন্যদিকে ওয়ানডেতে হয়েছিল বাংলাদেশ এক অপ্রতিরোধ্য দল, হয়তো বিশেষ কোনো টুর্নামেন্টের শিরোপা জিততে না পারলেও, জয়ের ধারাবাহিকতার মধ্যে ছিল বাংলাদেশ। অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের (পঞ্চপান্ডব খ্যাত সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ-মাশরাফি) উত্তরসূরি হিসেবে একঝাঁক তরুণ প্রতিভাবান ক্রিকেটার জাতীয় দলে স্থান করে নিয়েছেন। রিশাদ হোসেন (বিশ্বখ্যাত লেগ স্পিনার), তাওহীদ হৃদয়, তানজিদ হাসান তামিম, শরিফুল ইসলাম, তানজিম হাসান, পারভেজ হোসেন ইমন এবং মাহমুদুল হাসান জয়সহ অনেক তরুণ খেলোয়াড় নিজেদের পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আশা জাগিয়েছেন। একেবারে সাম্প্রতিক অমিত হাসানের কথা বলা চলে। নতুন প্রতিভা হিসেবে তারাই মূলত তারুণ্যের সম্ভাবনার মূল। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ ডিপিএল ও জাতীয় ক্রিকেট লিগ এনসিএল থেকে ধারাবাহিকভাবে ভালো পারফর্ম করা তরুণদের আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে তরুণ প্রতিভাদের খুঁজে বের করতে এবং তাদের উন্নত প্রশিক্ষণ ও ডেটা-চালিত কৌশলের মাধ্যমে তৈরি করতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তরুণদের ফিয়ারলেস বা নির্ভীক ক্রিকেট খেলার লক্ষ্যে দল গঠন করা হচ্ছে, যা টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডেতে সাফল্য পাওয়ার জন্য জরুরি।
তবে অভিজ্ঞতার অভাবের কারণে সিনিয়র খেলোয়াড়দের শূন্যস্থান পূরণ করতে তরুণদের কিছুটা সময় লাগছে, যা স্বাভাবিক। বড় মঞ্চে তরুণরা মাঝে মাঝে ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলে ম্যাচ হারতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তীব্র প্রতিযোগিতায় মানিয়ে নিতে তরুণদের আরও দায়িত্বশীল পারফরম্যান্স প্রয়োজন। সামগ্রিকভাবে, নতুন প্রতিভা এবং বিসিবির দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ তারুণ্যের কাঁধেই ভর করে এগোচ্ছে।
২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের গড় বয়স সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে থাকে। দলের সিনিয়র ও তরুণ খেলোয়াড়দের মিশ্রণ অনুযায়ী বয়সের একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলোÑ সিনিয়র খেলোয়াড় : মুশফিকুর রহিম (৩৮+ বছর)। মাঝারি বয়সী খেলোয়াড় : লিটন দাস (৩১), মেহেদী হাসান মিরাজ (২৮), নাজমুল হোসেন শান্ত (২৭)। তরুণ খেলোয়াড় : তানজিম হাসান সাকিব (২২), রিশাদ হোসেন (২৩)। ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের গড় বয়স ছিল ২৬.৮৭ বছর, যা সময়ের সাথে সাথে অভিজ্ঞদের উপস্থিতির কারণে কিছুটা বেড়েছে।
জাতীয় ক্রিকেট লিগ এনসিএলে অনেকে ভালো করছে। এখন এটা হয়ে ওঠেছে বিরাট প্রতিদ্বন্দ্বীতার স্থান। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের প্রতি বাড়তি আকর্ষণ সত্ত্বেও চারদিনের ক্রিকেটই আসল মানদন্ড। জাতীয় লিগের উন্নত উইকেট এবং প্রতিযোগিতা ভবিষ্যৎ তারকা তৈরি করতে সাহায্য করছে।
২০০৭ বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ এক নতুন পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে পৌঁছানো, এশিয়া কাপে একাধিকবার ফাইনাল খেলা। এখানেই শেষ নয়, প্রথমবারের মতো ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ও এসেছিল তাদের হাত ধরে। এরপর একে একে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো দলকে নাস্তানাবুদ করার গল্প সবকিছুতেই আধিপত্য ধরে রেখেছিলেন এই পাঁচজন।
সময়ের তাগিদে বাংলাদেশ ক্রিকেটের দলের ভার এখন মিরাজ-লিটন-শান্ত-শামিম-মুস্তাফিজুর-তাসকিনদের কাঁধে। তাই বর্তমান বাংলাদেশ দল যেনো তরুণ প্রজন্মের মিশেলে গড়া নতুন একটি দল সেইসাথে অনভিজ্ঞ। কিন্তু কথা হচ্ছে সামনের দিনগুলোতে তারা কি আদৌ ভূমিকা রাখতে পারবে?
সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সের দিকে যদি তাকালে দেখা যায়, দু একজন খেলোয়াড় বাদে বাকিদের নাস্তানাবুদ অবস্থা। না ভালো করতে পারছে টেস্ট ফরম্যাটে, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে কিংবা বাংলাদেশের প্রিয় ফরম্যাটে ওয়ানডেতে।
এর প্রধান কারণ দল নির্বাচনে দুর্বলতা, দুর্বল ম্যানেজমেন্ট, মেধার ঘাটতি, জবাবদিহিতার অভাব, গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা বসে আছেন তাদের নিজেদেরও যোগ্যতার অভাব, ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো ভেঙে পড়া ও ভুলভাল জিনিসে প্রাধান্য দেওয়া। যেখানে ভালো কোচ, নামি কোচ এনেও তো কিছু করা যাচ্ছে না, সেইসাথে অধিনায়ক পরিবর্তন করেও। আর এই খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। যার ফলে আরব আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্রের মতন দলের কাছে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে।
শুধু কি তাই, একটা সময় যেখানে বাংলাদেশের ক্রিকেট দল থেকে শুরু করে দর্শকরা যেখানে চিন্তা করত, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো খেলোয়াড়দের সাথে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সামর্থ্য আমাদের আছে সেখানে তাদেরকে এখন অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বাংলাদেশের হতশ্রী পারফর্মেন্সের কথা ধরা যাক। ছিটেফোঁটা দুএকটা ম্যাচ সিরিজ জিতলেও এখনও কোন বৈশ্বিক শিরোপা জেতা সম্ভবপর হয়নি। অথচ সময়টা কম হয়নি।
যে বাংলাদেশ ৩০০ বা ৩০০ অধিক কিংবা ২৮০ রান তোলার মতো ক্ষমতা রাখে, সে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ২৫০ এর উপর রান তুলতে পারেনি। অন্যদিকে সিরিজ ম্যাচগুলোতে অবস্থা আরো খারাপ। ১০০ রান যোগ করা মাত্রই বাংলাদেশের দায়িত্বহীন ব্যাটিং শুরু হয়ে যায়। যার ফলে অনেক জেতা ম্যাচ বিশাল ব্যবধানে হারের বোঝা সাথে নিয়ে চলে আসতে হয়।
আর বর্তমানে ওয়ানডে থেকে শুরু যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের অবস্থা অনেকটাই এইরকম কোনোদিন বোলিং ভালো হচ্ছে না। কোনোদিন ব্যাটিং। আবার কোনোদিন দুটাই খারাপ। বর্তমান দলের যে পারফরম্যান্স তাতে মনে হতেই পারে জয়ের ক্ষুধাটাও যেনো তাদের নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ এই প্রথম ভারতে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপই খেলেনি। যা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যার বিরূপ প্রভাব ক্রিকেটারদের ওপর পড়েছে।
আর তার থেকেও বড় সমস্যা হলো কোচিং প্যানেলের দুরবস্থা। বর্তমান কোচিং প্যানেলে ফিল সিমন্স থেকে শুরু করে মুসতাক আহমেদের মতো কোচরা রয়েছেন, কিন্তু বাংলাদেশের দরকার এই মুহূর্তে দেশীয় কোচদের প্রাধান্য দেওয়া। সালাউদ্দিন সহকারী কোচ হয়ে আসলেও, বাংলাদেশ ক্রিকেট এখনো বিদেশি ফর্মুলাতে বিশ্বাসী। যার ফলে অনেক সময় বিদেশি খেলোয়াড়রা ক্রিকেটারদের সঠিক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় থেকে শুরু করে সমস্যাগুলো নিয়ে কাউন্সিলিং করতে পারে না। এর আরো একটি কারণ ভাষাগত সমস্যা। সালাউদ্দিন নানা কারণে আর জাতীয় দলে থাকতে চাচ্ছেন না। মোটের উপর দেশি কোচরা কেন যেন জাতীয় দলে টিকতে পারেন না। আসেন কদিনের জন্য তারপর নানা কারণে হারিয়ে যান।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কোচিং পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়ে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, কোচদের খেলোয়াড় সিদ্ধান্তে স্বাধীনতা না দেওয়া, যা প্রফেশনাল কোচকে নিরুৎসাহিত করে। অনেক সময় কোচদের সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করা হয়, যা তারা পছন্দ করেন না। শীর্ষস্থানীয় কোচরা সাধারণত এমন দলে কাজ করতে চান যেখানে পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে।
বাংলাদেশে কোচদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধৈর্যের অভাব দেখা যায়। ফলাফল দ্রুত চাইতে গিয়ে কোচদের ওপর চাপ দেওয়া হয়, যা অনেক বিশ্বমানের কোচ পছন্দ করেন না। তারা সাধারণত এমন দল খোঁজেন যেখানে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সময় দেওয়া হবে। যার ফলে জেমি সিডন্স, অ্যানাল ডোনান্ড, স্টিভ রোডসের মতো অনেক হাইপ্রোফাইল কোচরা বাংলাদেশে খন্ডকালীন দায়িত্বে এসে অল্পতেই হারিয়ে গিয়েছে।
তাছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের তামিম-সাকিব-মুশফিক থাকাকালীন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় তৈরি না হওয়ার আরো একটি কারণ হলো খেলোয়াড়দের নিয়মিত ম্যাচ খেলোনো। একজন ক্রিকেটারের সাথে ইনজুরির সম্পর্ক বেশ পুরোনো। তাই কিছু ম্যাচ শেষে বিশ্রামেরও প্রয়োজন। বাংলাদেশ ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের মানসিক এবং শারীরিক চাপের ওপর লক্ষ্য না রেখে খেলানো হয়। এতে করে তাদের ধারাবাহিক পারফর্মেন্সে ঘাটতি দেখা যায়।
ভারত-অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের মতো দল যেখানে প্রতিটি ফরম্যাটে বাড়তি খেলোয়াড় তৈরি করার ক্ষমতা রাখে সে জায়গায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। যার ফলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা ভিন্ন ভিন্ন ফরম্যাটের ধ্যানধারণা সম্পর্কে অবগত নয়। এর পিছনেও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তা হলো অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারদের যত্ন না নেওয়া।
বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল নিয়মিতভাবে ভালো পারফর্ম করে, এমনকি ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপও জিতেছে। সেইসাথে ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে পরপর দুইবার এশিয়া কাপ জেতার কর্তৃত্বও দেখিয়েছে। তবে সিনিয়র দলে এসে অনেক ক্রিকেটার প্রত্যাশিত উন্নতি করতে পারে না। এর কারণ হলো সঠিক মনিটরিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং মানসিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি। অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটার ঘরোয়া ক্রিকেটে ভালো করলেও জাতীয় দলে জায়গা পেতে দেরি হয় বা নিয়মিত সুযোগ পান না।
আর বরাবরের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের মান যেনো ক্রিকেটের উন্নতিতে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের গুণগত মানের দিকে তাকালেই ফুটে উঠে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সাথে অসামঞ্জস্যতা। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে পিচের মান, প্রতিযোগিতার তীব্রতা না থাকা। তীব্র চাপের মুখে অবশেষে মিরপুর শেরেবাংলায় সবুজ উকেট করা হয়েছে। যা ব্যাটারদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটকে সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিমদের প্রজন্ম একটি পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু সেখান থেকে আর ওপরে তুলতে না পারার জন্যই দেশের ক্রিকেট আবারো অসুবিধার সম্মুখীন হয়েছে। তার কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভালো মানের বিকল্প খেলোয়াড় তৈরি করতে পারেনি। যেখানে বাইরের বড় দলগুলো যখন সিরিজ ভেদে বিভিন্ন ধরণের খেলোয়াড় তৈরি করে নতুন জাতীয় দল গড়ার চেষ্টা করছে সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত এক দল নিয়ে খেলিয়ে যাচ্ছে, যা খেলোয়াড়দের স্কিল সমস্যা এবং ইনজুরি প্রবণতা বাড়ার জন্য দায়ী।
তাছাড়া এইচপি বা অনূর্ধ্ব-১৯ এর খেলোয়াড়দের লক্ষ্য থাকে জাতীয় দলে খেলার। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো স্বপ্নটা কিন্তু ওখানেই থেমে যায়। জাতীয় দলে খেললে এরপর কীভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে সেটা তারা জানে না। তাদের আসলে কী ধরনের লক্ষ্য হওয়া উচিত, মেন্টালিটি হওয়া উচিত, কীভাবে আরও বড় খেলোয়াড় হওয়ার জন্য নিজেকে মোটিভেট করা উচিত এই বিষয়ে তাদের ধারণা থাকে না।
তাছাড়া বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আরো একটি বড় সমস্যা হলো যুক্তির চেয়ে আবেগকে প্রাধান্য দেয় বেশি। বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড় বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। মাঠে অযথা উত্তেজনা, স্লেজিংয়ে জড়িয়ে পড়া বা সিদ্ধান্তে বেশি প্রতিক্রিয়াতে জড়িয়ে যায়।
অন্যদিকে একটি ম্যাচে কেউ ভালো করলে পরের সিরিজেই তাকে জায়গা দেওয়া হয়, আবার সামান্য খারাপ করলেই বাদ এখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ ও জনমতের প্রভাব বেশি কাজ করে।
আধুনিক ক্রিকেটে বিশ্লেষণ, পরিসংখ্যান, ম্যাচ কন্ডিশন অনুযায়ী একাদশ গঠন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনেকাংশেই সেই ধরনের ‘ক্রিকেটিং ইন্টেলিজেন্স’ অনুপস্থিত।
যুক্তিসঙ্গতভাবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দল গড়ার কথা থাকলেও, তা অনুপস্থিত। তড়িঘড়ি করে সিদ্ধান্ত, নতুন খেলোয়াড় এনে আবার বাদ দেওয়া এসব সিদ্ধান্ত যুক্তির বদলে আবেগনির্ভর প্রাধান্য থাকে।
বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের পারফরম্যান্স অনেক সময় বড় দলগুলোর তুলনায় খুব একটা শক্তিশালী নয়, বিশেষ করে টেস্ট, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। তার সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে বাংলাদেশের কমফোর্টজন ফরম্যাট ওয়ানডে।
অনেক বড় দল, বিশেষ করে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, বা দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার সময়ে সে দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে না, কারণ তারা জানে যে বাংলাদেশ বেশিরভাগ সময় তাদের জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি।
বড় দলগুলো আইসিসির বিভিন্ন ইভেন্টে প্রস্তুতির জন্য তাদের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বেছে নেয়, যাতে পরবর্তী টুর্নামেন্টের প্রস্তুতির জন্য উপযুক্ত প্রতিপক্ষ হতে পারে। সে জায়গায় বাংলাদেশ খেলে জিম্বাবুয়ের মতো দলের সাথে।
বাংলাদেশ ক্রিকেটের পঞ্চপান্ডব (মাশরাফি বিন মুর্তজা, সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ) এর অবসরের মধ্যে দিয়ে একটি সোনালী যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। তারা দলকে যা দিয়ে গিয়েছে, তা ধরে রাখতে তরুণদের দক্ষতার সহিত দায়িত্ব নিতে হবে।
আর তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তরুণদের ওপর আস্থা রেখে অন্তত ২ থেকে ৩ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। একজন খেলোয়াড়কে ২ সিরিজ খেলিয়ে বাদ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।
অন্যদিকে অধিনায়ক হতে হবে সঠিক গুণাবলী ও নেতৃত্ববান সম্পন্ন। বর্তমান বাংলাদেশের অধিনায়ক লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, নাজমুল হোসেন শান্তকে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এগোতে হবে। নিজেকে সময় দিতে হবে, দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। উদীয়মান খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে হবে। শামীম পাটোয়ারী, পারভেজ ইমন, তৌহিদ হৃদয় এদের নিয়ে লম্বা সময় পরিকল্পনা সাজাতে হবে। তাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। সেইসাথে হুট করে নেতৃত্ব বদল না করে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্কিপারদের ওপর আস্থা রাখা দরকার।
নতুনদের ব্যাটিং লাইনআপে স্ট্রাইক রেট ও ম্যাচ-ফিনিশিং দক্ষতা উন্নত করতে হবে। পাওয়ার হিটিং স্কিল ডেভেলপ করতে হবে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডের জন্য। সেই সাথে মিডল অর্ডারে অভিজ্ঞ, পজিশনভিত্তিক বিকল্প খেলোয়াড় ও টেকনিক্যালি দক্ষ ব্যাটসম্যান দরকার।
যেমন উইকেট কিপিং ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান সোহান, মহিদুল ইসলাম অংকন এবং অলরাউন্ডিং পজিশনে মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, জাকের আলীর মতো খেলোয়াড়দের ব্যাকআপ হিসেবে তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনমতো খেলাতে হবে।
এইবার আসা যাক বোলিং ইউনিটের দিকে স্পিন নির্ভরতা কমিয়ে পেস আক্রমণ আরও শক্তিশালী করা দরকার, বিশেষ করে বিদেশের মাটিতে ভালো করতে হলে এর বিকল্প নেই। ইয়র্কার ও ভ্যারিয়েশন শিখতে হবে বোলারদের, ডেথ ওভারে কার্যকর হতে হবে। তাসকিন, মুস্তাফিজ, শরিফুল নবাগত নাহিদ রানা নিয়ে পেস ব্যাটারি বাংলাদেশের জন্য বাড়তি শক্তি।
অন্যদিকে চাপের মধ্যে ভালো খেলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে এবং বিদেশি কন্ডিশনে ভালো করার জন্য মানসিক প্রশিক্ষণ দরকার, সেই সাথে খেলোয়াড়দের শৃঙ্খলা ও মানসিকতার উন্নতির দিকেও লক্ষ্য রেখে স্পোর্টস সাইকোলজিস্ট নিয়োগ করতে হবে।
ডিপিএল এবং বিপিএলকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করা ও তরুণদের সুযোগ দেওয়া দরকার। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটকে উন্নত করতে হবে, যেন টেস্ট ক্রিকেটের জন্য খেলোয়াড় তৈরি হয়।
খেলোয়াড়দের বাইরের দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলার সুযোগ দিতে হবে। এতে করে অনেক ধরনের উপকার হতে পারে। বিদেশি খেলোয়াড় ও কোচদের সঙ্গে খেলার মাধ্যমে টেকনিক ও কৌশল উন্নত হয়। ড্রেসিংরুম ভাগাভাগিতে অনেক কিছু শেখা যায়।
যারা বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়েছেন তাদেরকে বাংলাদেশ ক্রিকেটে মেন্টরশিপ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, এবং খেলোয়াড়দের নিয়ে আলাদা কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
খেলোয়াড়দের সাথে বোর্ডের কর্মকর্তাদের খোলামেলা এবং স্পষ্টভাবে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাদের সমস্যাগুলো শোনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সমাধান করতে হবে। সেই সাথে খেলোয়াড়দের বাজে পারফরম্যান্সের সময় বোর্ড কর্মকর্তাগণ তা নিয়ে তাদের সাথে সহমর্মিতাস্বরূপ আলোচনা করতে পারে। গঠনমূলক সমালোচনা করতে হবে তা যেন খেলোয়াড়দের উন্নতির পথ দেখায়।
এর পাশাপাশি বড় বড় দলের সাথে ঘন ঘন সিরিজ আয়োজনের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে করে বিশ্বমঞ্চে খেলতে গেলে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তারা ম্যাচ খেলতে পারে। এখন প্রয়োজন বিশ্বসেরা কোচ নিয়োগ। কোচদের স্বাধীনতা, ভালো পারিশ্রমিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। শীর্ষস্থানীয় কোচের পাশাপাশি দেশীয় কোচদের নিয়োগ দিতে হবে। এতে করে দেশীয় কোচরাও ভিন্ন কিছু বিষয় রপ্ত করার সুযোগ পাবে, সেইসাথে দেশীয় কোচদেরও সঠিক মূল্যায়ন হবে। ঢাকার ক্রিকেট তখন ছিল বহমান নদীর মতো। সেই নদীতে একটু একটু করে বাঁধ দিতে থাকে বিসিবির অদ্ভুত কিছু সিদ্ধান্ত। যে কোনো খেলার মতো ক্রিকেটেরও প্রাণ হচ্ছে কিশোর-তরুণরা। ক্রিকেটের প্রতি তাদের আগ্রহ এবং তাদের বেড়ে উঠার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিরবচ্ছিন্ন রাখার মধ্যেই ক্রিকেট এগিয়ে যায়। নানা করণে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা বিরাজ করছে দেশের ক্রিকেটে।
দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে প্রয়োজন তারুণ্যনির্ভর লিগগুলোকে সব রকমের বাধা বিপত্তি সরিয়ে এগিয়ে নেওয়া। ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দিতে হবে সারা দেশে, করতে হবে বিকেন্দ্রীকরণ। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটের ভোটার কমিয়ে বাড়াতে হবে জাতীয় ক্রিকেট লিগের প্রতিটি বিভাগীয় দলের ভোট। ক্লাবকে শক্তিশালী করতে হবে। ক্লাবকে আবারও কমিউনিটির প্রতীক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে বাচ্চারা খেলতে আসবে, তাদের বাবা-মায়েরা খেলতে পাঠাবে। এলাকার লোকজনই ক্লাবের দায়িত্ব নেবে। বিভাগের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে শক্তিশালী করা, প্রতিটি বিভাগে অবকাঠামো তৈরি করা হলে, টুর্নামেন্ট আয়োজন করে বিভাগের খেলোয়াড়দের আয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বিভাগের সেই ক্রিকেট উন্নয়ন ছড়িয়ে পড়বে প্রতিটি জেলায়। তাতে সামগ্রিকভাবে সমৃদ্ধ হবে দেশের ক্রিকেট। ক্রিকেট কাঠামোটা হতে হবে এমন যেখানে প্রতিযোগিতা হবে মুখ্য, দক্ষতা হবে মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি। তবেই হয়তো ক্রিকেট মাঠে দর্শক ফিরে আসবে।
তারুণ্যের আবির্ভাবের মধ্যেই বাংলাদেশের ক্রিকেট এগিয়ে যাবে। তরুণেরাও উঠে আসছেন। হাতে যখন বেছে নেওয়ার মতো অনেকেই থাকেন, তখন ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বয়স আর ফিটনেস ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় বৈকি। সঙ্গে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার ব্যাপার তো আছেই। বাংলাদেশ দল কাদের দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখবে পরের ধাপে যাওয়ার?
তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজরা মাশরাফি সাকিব তামিমদের পারিষদেও ছিলেন। আগামীতে তাদের কাছে আরও বড় তারকা হয়ে ওঠার প্রত্যাশা থাকবে। সব সংস্করণ মিলিয়ে বললে মুমিনুল হক, মোস্তাফিজুর রহমান, লিটন দাস, আফিফ হোসেন, তৌহিদ হৃদয়, শরীফুল ইসলাম, মাহমুদুল হাসানদের ঘিরেও আশার প্রদীপ জ্বলবে। তরুণদের মধ্যে তানজিম সাকিব, তানজিদ তামিমদের পর এসেছেন রিশাদ হোসেন। এসব মুখ পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশ দলের ভবিষ্যৎ চেহারা কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়। এদের মধ্যে টিকে থাকা আর নির্ভরতার পরীক্ষায় যারা ভালোভাবে উত্তীর্ণ হবেন, আগামী দিনের দেশের তারকা হয়ে উঠবেন তারাই। আবার এখনো দৃশ্যপটে আসেননি, তেমন কেউও সামনে এসে যেতে পারেন সবাইকে চমকে দিয়ে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের তরুণরা। এই তরুণরা আমাদের আগামীর সম্পদ। শিক্ষিত দেশপ্রেমিক সচেতন সাহসী আত্মবিশ্বাসী এই তরুণ প্রজন্ম আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা প্রযুক্তি জ্ঞানে সমৃদ্ধ, খেলাধুলা-সংস্কৃতিতে এগিয়ে, দেশের প্রশ্নে আপসহীন। এই প্রজন্ম একাত্তরে সুমহান আত্মত্যাগ ও দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস জানে, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের কথা জানে, শহীদদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। আত্মসচেতন এই তারুণ্যের শক্তি নতুন বছরে হাজারো সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, এটাই আমার বিশ্বাস।
খেলার সঙ্গে কোনো কিছু মেলানো যায় না। তারুণ্যের প্রতি বিশ্বাস হারানো চলবে না। আজ জিততে পারিনি তো কাল জিতব, না হলে পরশু। হারি বা জিতি স্টেডিয়ামে আমাদের দেশের পতাকা উড়ুক, চিৎকার হোক বাংলাদেশ।
ক্রিকেট নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ নেই। ক্রিকেটই আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে আমাদের মর্যাদাকে সবচেয়ে বেশি প্রতিষ্ঠিত করেছে। আন্তর্জাতিক আসরে ক্রিকেটে সাফল্য পাওয়ার কারণে এই খেলাটির জনপ্রিয়তা এখনো সবচেয়ে বেশি। যে ক্রিকেট একদা ছিল শহুরেদের খেলা বলে পরিচিত, সেই ক্রিকেট এখন কতটা তৃণমূলে পৌঁছে গেছে তা কল্পনাও করা যায় না। গাঁওগেরামেও এখন ক্রিকেটের কদর সবচেয়ে বেশি। আর তাই পরিত্যক্ত ভূমি, চর, এমনকি খানাখন্দেও দেখা যায় আমাদের তরুণ, কিশোর এবং শিশুরা ক্রিকেট খেলছে। ক্রিকেট নিয়ে মহাউল্লাসে মেতে আছে।
ক্রিকেট আজ যে সাফল্য সেটা একদিনে আসেনি। অনেক পরিকল্পনা, পরিশ্রম, লগ্নির বিনিময়েই এসেছে। যেমন একজন সাবের হোসেন চৌধুরীÑ ক্রীড়ামোদীদের হৃদয়ে চিরকালই উজ্জ্বলতর হয়ে থাকবেন শুধু তার ক্যারিশম্যাটিক সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে। সবারই মনে থাকার কথা নব্বইয়ের দশকে বিসিবির সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশকে টেস্ট খেলার মর্যাদা এনে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকায় ছিলেন তিনি। শুধু এই নয়, বিসিবির সভাপতির দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিশ্ব ক্রিকেট-কূটনীতিতে তিনি অসাধারণ পারঙ্গমতা প্রদর্শন করে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে যাওয়ার সঠিক পথ রচনা করে দিয়েছিলেন।
বর্তমান সময়ে ক্রিকেটে যে সাফল্য সেখানে ব্যর্থতাও কম নেই। সেই ব্যর্থতার যে দায় সেটা ক্রিকেট ম্যানেজমেন্ট কিন্তু এড়াতে পারেন না। ক্রিকেটে অনেক কিছুই হচ্ছে আবার অনেক কিছুই মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিশেষ করে সাফল্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা, নতুন খেলোয়াড় তৈরি এবং এর স্থিতিশীলতা বজায় রাখাটাই এখন যেন সংশয়ে ভরা। সাকিব, মাশরাফি, মুশফিক, তামিম, মুস্তাফিজরা আমাদের গর্ব, কিন্তু এরপর পেছনে কে? প্রতিভাবান ক্রিকেটার খুব বেশি আসছে না। টুকটাক যারা আসছে তাদের রেকর্ড আশা জাগানো নয়। যারা আসছে তারা খুব বেশি সময় ক্রিজে দাঁড়াতে পারছে না। ক্ষণস্থায়ী পারফরম্যান্স তাদের। আর তাই অনেকেই দলে নিয়মিত হতে যেমন পারছেন না, তেমনি তাদের পারফরম্যান্সও উল্লেখ করার মতো নয়। এ কারণেই নির্বাচকরা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করছেন প্রকাশ্যেই। মমিনুল, সৌম্য সরকার, লিটন দাস, তাইজুল খুব বেশি স্থায়ী হতে পারেনি। কখনো কখনো তারা ভীষণরকম ভালো খেললেও ধারাবাহিকতা নেই। ব্যাট-প্যাড নিয়ে তাই মাঠের বাইরে বসে থাকতে হচ্ছে তাদের। এ দৃশ্য আমাদের ক্রিকেটের জন্য খুব ভালো কিছু নয়। ক্রিকেটে এখনো নতুন ক্রিকেটারদের যে আগমন এবং নির্গমন সেটা অনেক ধরনের আশঙ্কাই তৈরি করছে। বিসিবিকে তাই নতুন নতুন ক্রিকেটার তৈরিতে আরো কর্মকৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
আমাদের সবারই লক্ষ্য হতে হবে ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়া। নতুন নতুন খেলোয়াড় তৈরি আর তৃণমূলের ক্রিকেটকে উজ্জীবিত করতে আরো মনোযোগী হওয়া। আবার সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যে ক্রিকেট আজ গৌরবময় স্থানে অধিষ্ঠিত, সবার মতামত ও অভিপ্রায়ের সঠিক মূল্যায়নটাও তাও সূচকে থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বর্তমান শক্তির অন্যতম দিক হলো তাদের ব্যক্তিগত প্রতিভা। তবে, দল হিসেবে আরও শক্তিশালী হতে হলে ব্যাটিং এবং বোলিংয়ের মধ্যে সঠিক সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে দলের ব্যাটিং লাইনআপে ধারাবাহিকতার অভাব দেখা যায়, বিশেষ করে টপ অর্ডারে। বড় স্কোর গড়তে বা বড় লক্ষ্য তাড়া করতে হলে ব্যাটসম্যানদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। একইভাবে, বোলিংয়েও স্পিনাররা যতটা সফল, পেসারদের কাছ থেকে বিদেশের মাটিতে তার চেয়ে আরও বেশি কিছু আশা করা হয়। যদি ব্যাটসম্যানরা বড় স্কোর গড়তে পারে এবং পেসাররা নতুন বলে উইকেট নিতে পারে, তাহলে স্পিনারদের কাজ আরও সহজ হয়ে যাবে। এই সমন্বয় সাধিত হলে দল যেকোনো পরিবেশে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সমানতালে লড়তে পারবে। ব্যাটিং এবং বোলিংয়ের এই ভারসাম্যই বাংলাদেশকে বিশ্ব ক্রিকেটে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার জায়গা হলো তরুণ ক্রিকেটারদের ধারাবাহিক উত্থান। সৌম্য সরকার, লিটন দাস, নাঈম শেখ এবং তাসকিন আহমেদ-এর মতো খেলোয়াড়রা এখন দলের মূল শক্তি। এসব তরুণ ক্রিকেটারের পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা দলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। যদিও ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো এবং বিপিএল-এর মতো লিগগুলোর মান নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন আছে, এসব বাধা পেরিয়েই নতুন ক্রিকেটাররা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে উঠে আসার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি এখন দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বিশেষভাবে মনোযোগ দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটি ক্ষেত্র হলো উইকেট ডেভেলপমেন্ট এবং মানসম্মত কোচিং। আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড় তৈরির জন্য আন্তর্জাতিক মানের উইকেট তৈরি করা অপরিহার্য। তাই দেশের বিভিন্ন স্টেডিয়ামের উইকেটগুলোকে আরও মানসম্মত করার জন্য বিসিবি কাজ করছে, যাতে ক্রিকেটাররা ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। একই সাথে, তরুণ ও অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের দক্ষতা বাড়াতে দেশি ও বিদেশি ভালো কোচের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী কোচিং প্যানেল গঠন করা হয়েছে। দেশি কোচরা স্থানীয় ক্রিকেটারদের মানসিকতা বোঝেন, অন্যদিকে বিদেশি কোচরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নতুন নতুন কৌশল ও ধারণা নিয়ে আসেন। এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে বিসিবি শুধু আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটার তৈরি করছে না, বরং একটি টেকসই ক্রিকেট সংস্কৃতির ভিতও গড়ে তুলছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বর্তমানে একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকলেও, বিশ্বের সেরা দলগুলোর সাথে তাদের মূল পার্থক্য এখনো রয়ে গেছে। এই পার্থক্যটি মূলত মানসিকতা এবং পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়। শীর্ষ দলগুলো যেমন ভারত, অস্ট্রেলিয়া বা ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ডের মতো দলগুলো যেকোনো পরিস্থিতিতে চাপ সামলে জয়ের অভ্যাস গড়ে তুলেছে। তারা শুধু নিজেদের কন্ডিশনে নয়, বিদেশের মাটিতেও সমানভাবে আগ্রাসী ক্রিকেট খেলে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে এই মানসিক দৃঢ়তার অভাব প্রায়ই দেখা যায়, বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ এবং নক-আউট ম্যাচগুলোতে।
পাশাপাশি, পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতাও একটি বড় ফ্যাক্টর। বাংলাদেশের কিছু খেলোয়াড় মাঝে মাঝে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখালেও, নিয়মিতভাবে তাদের সেই মান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। যেখানে ভালো দলগুলোর প্রতিটি খেলোয়াড়ই তাদের ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন এবং ধারাবাহিক পারফর্ম করার সামর্থ্য রাখে। এই মানসিক দৃঢ়তা এবং ধারাবাহিকতাই বাংলাদেশকে একটি ‘ভালো দল’ থেকে ‘সেরা দল’-এ পরিণত করতে পারে।
বড় কোনো টুর্নামেন্টে ট্রফি জেতার মতো দল হয়ে ওঠার পেছনে কিছু বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ধারাবাহিকতার অভাব। দল হিসেবে বাংলাদেশ মাঝেমধ্যে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখালেও, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারে না। এছাড়া, ব্যাটিং ও বোলিংয়ে সব ফরম্যাটে সার্বজনীন পারফর্মারের অভাব রয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন ক্রিকেটারের ওপর নির্ভরতা দলকে অনেক সময় চাপে ফেলে দেয়। বিশেষ করে, চাপের মুহূর্তে ক্রিকেটারদের মানসিক দৃঢ়তার অভাব প্রায়ই দৃশ্যমান হয়। ভালো দলের বিপক্ষে বড় স্কোর তাড়া করা বা বড় লক্ষ্য রক্ষা করার ক্ষেত্রে প্রায়ই দল ব্যর্থ হয়। এই বাস্তবতাগুলোই ট্রফি জয়ের স্বপ্নকে এখনও অধরা করে রেখেছে। তবে, নতুন করে শুরু করা এবং দলগত পারফরম্যান্সে মনোনিবেশ করার মাধ্যমে এই বাস্তবতা বদলানো সম্ভব।
জাতীয় লিগে তরুণদের পারফরম্যান্স অনেক ভালো। তারাও আরও ভালো খেলুক। সন্দেহ না হয় তাদের পারফরম্যানস নিয়ে। যদি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সন্দেহ নিয়ে একটা ক্রিকেটারকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে সে ভালো করে তাহলে ব্যাপারটা ভালো। খারাপ করলে দারুণ একটা সম্ভবনা নষ্ট হওয়ার সুযোগ চলে আছে। ক্রিকেটাররা ধারাবাহিক রান করুক। ম্যাচিউর হোক। যেন মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় যেন সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত। এ বছর অমিত হাসানের নাম এসেছে। তার ট্যাম্পারম্যান্ট খুব ভালো।
বাংলাদেশ জাতীয় লিগ দেশের ক্রিকেট কাঠামোর ভিত্তি হয়ে উঠেছে, যেখানে তরুণ খেলোয়াড়রা নিজেদের প্রমাণের সুযোগ পান। জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়া অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের শূন্যস্থান পূরণে তরুণদের সময় প্রয়োজন। জাতীয় লিগ এবং বিসিএল থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তুলে আনা তরুণরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপযুক্ত হতে পারবেন।
খেলোয়াড় নির্বাচনে দুর্বলতা, দুর্বল ম্যানেজমেন্ট, মেধার ঘাটতি, জবাবদিহিতার অভাব, গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা বসে আছেন তাদের নিজেদেরও যোগ্যতার অভাব, ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামোর ভেঙে পড়া ও ভুলভাল জিনিসে প্রাধান্য দেওয়া, বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে খারাপ দিক। যেখানে ভালো কোচ, নামি কোচ এনেও তো কিছু করা যাচ্ছে না, সেইসাথে অধিনায়ক পরিবর্তন করেও। আর এই খেসারত দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে। একাদশের ক্রিকেটাররা তাদের উপলব্ধি জানিয়েছেন, বেশিরভাগ ক্রিকেটারের মুখেই যথেষ্ট সুযোগ না পাওয়ার আক্ষেপ।
ছোট্ট চোখে বিরাট স্বপ্ন, যেতে হবে ওই চূড়ায়। পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। যে পথে