বাজেট হতে পারে সারে ৮ লাখ কোটি টাকার, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

সুমন হাওলাদার

জাতীয়

বৈশ্বিক যুদ্ধপরিস্থিতির অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং চলমান সংস্কার

2026-04-05T11:47:39+00:00
2026-04-05T11:47:39+00:00
  মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
বাজেট হতে পারে সারে ৮ লাখ কোটি টাকার, বাড়বে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি
আসছে রাজনৈতিক ওয়াদাপূরণের বাজেট
সুমন হাওলাদার
রোববার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৭ এএম 

বৈশ্বিক যুদ্ধপরিস্থিতির অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা, নতুন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি,  বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম বিবেচনায় রেখে আসছে এযাবৎকালের বৃহৎ বাজেট।

অর্থমন্ত্রণালয়ের অর্থবিভাগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য তিনটি বিবেচনা বাজেট রূপরেখার খসড়া তৈরি করেছে।  এর প্রথমটি হচ্ছে ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপ নিলে ব্যয় সাশ্রয়ী বাজেটের আকার হতে পারে সোয়া আট লাখ কোটি টাকা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাজেট প্রণয়ন। এই বিবেচনায় কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিলে বাজেটের আকার আট লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা। তৃতীয়ত, ব্যয় সাশ্রয় ও রাজনৈতিক বিবেচনার মাঝামাঝি অবস্থান থেকে বাজেট প্রণয়ন। এক্ষেত্রে বাজেটের আকার হতে পারে সাড়ে আট লাখ কোটি টাকা। মাঝামাঝি অবস্থান থেকে যাতে বাজেট প্রণয়ন করা যায়, সেই সুযোগও রূপরেখায় রাখছে ।

আগামী বাজেটের এডিপির সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে আড়াই লাখ কোটি টাকা। তবে মোট বাজেটের আকার পরিবর্তন হলে এডিপিও সে হারে সমন্বয় হবে। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৬ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

এবিষয়ে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় এনবিআরকে চিঠি দিয়ে বলেছে, নবগঠিত সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন-পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন, ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতির উন্নয়ন কর্মসূচি তুলে ধরা হয়েছিল। এসব বিষয় আমলে নিয়ে আগামী বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পাশাপাশি ২০২৭-২৮ ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরের গৃহীতব্য অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা উল্লেখ থাকতে হবে। একই ধরনের চিঠি দেওয়া হয়েছে বাজেট প্রণয়নসংশ্লিষ্ট সরকারের মন্ত্রণালয়-বিভাগকেও।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

 আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে প্রবাসী আয়ের প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই অতিরিক্ত আশাবাদিতা পরিহার করে বাস্তব সক্ষমতার ভিত্তিতে রাজস্ব ও ব্যয়ের কাঠামো নির্ধারণের পরামর্শ দেন তারা।

সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ সম্প্রতি এক প্রাক-বাজেট আলোচনায় বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত অস্থির ও অনিশ্চিত। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাজেট প্রণয়নে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ প্রাক্কলন যে কোনো সময় পরিবর্তিত হতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ার কথা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে গেছে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এখন স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ। এ বছরের বাজেট খুব বড় করা উচিত নয়, কারণ বড় বাজেটে অপচয়ের ঝুঁকি থাকে। তাই সংকোচনমূলক বাজেট ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ জরুরি।  মূল্যস্ফীতি ৬-৭ শতাংশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা উচিত। 

তিনি মনে করেন, খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি, জ্বালানি (নবায়নযোগ্যসহ), শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী জাতীয় বাজেটে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর প্রতিফলন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারকদের এমনভাবে বাজেট প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর অগ্রগতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।  আগামী জুনে পেশ হতে যাওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে যেন বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন থাকে।

বিএনপি অর্থনৈতিক খাতে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানো, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার। এছাড়া স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপি’র ৫ শতাংশের বেশি করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে দলটির। এসব খাতে জিডিপির বিবেচনায় ব্যয় বাড়াতে গেলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে।

সরকারের আলোচিত প্রতিশ্রুতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দেশব্যাপী ফ্যামিলি কার্ড চালু করা, কৃষি কার্ড, ই হেলথ কার্ড অন্যতম। শুধুমাত্র ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়ন করতে হলে বছরে সরকারের বাড়তি ব্যয় হবে ১২ হাজার কোটি থেকে ২৪ হাজার কোটি টাকা।

আবার বিএনপি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণও মওকুফ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করতে গেলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য সহায়তা কর্মসূচি ছাড়াও জ্বালানি ও খাদ্য সরবরাহ স্থিতিশীল রাখার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে দলটির।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পাবে। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের পাশাপাশি বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার এবং মধ্যমেয়াদে আগামী ২ অর্থবছরের জন্য সংস্কারের রূপরেখা থাকবে। এ লক্ষ্যে বাজেট প্রণয়নে ইতোমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) নির্দেশ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। 

বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের যাত্রা কোনো গোষ্ঠীর বিশেষ সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং দেশের প্রতিটি নাগরিকের উৎপাদনশীল শক্তির ওপর ভর করে গড়ে তোলা হবে। এই ভিশনের কেন্দ্রে রয়েছে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন-যেখানে অর্থনীতি হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। অর্থনীতিতে অলিগার্ক কাঠামো ভেঙে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। যেখানে প্রতিটি নাগরিকের প্রকৃত অংশীদারত্ব থাকবে। 

ইশতেহারে আরও বলা হয়, বিএনপির প্রধান উদ্দেশ্য হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ঋণনির্ভর অর্থনীতিকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরই হবে মূল লক্ষ্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি হবে চালিকাশক্তি। বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর করা, যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা হবে। 

 অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, বাজেটে গৃহীত কার্যক্রমের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়নের সম্ভাব্য রূপ, সরকারি বিনিয়োগের ওপর রিটার্ন বৃদ্ধি এবং এসব বিনিয়োগের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সৃষ্টিশীল শিল্পকে সহায়তা দিতে কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে। ২০৩৪ সালে ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি-অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, ব্যবসা সহজীকরণ, দারিদ্র্য নিরসন, সামাজিক সুরক্ষা, অসমতা কমানো, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সুনীল অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।

বাজেট প্রসঙ্গে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিড)এর সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, দেশের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে যে পর্যায়ে রয়েছে, আগামী বাজেটের পর তা আরো বাড়তে পারে। দেশ এখন নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বাস্তবসম্মত ও সংস্কারভিত্তিক হওয়া প্রয়োজন। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং আমদানি ব্যয় বাড়ার কারণে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানি ব্যয় বাড়লে চলতি হিসাবের ঘাটতি ভাড়া এবং বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি দেশের পূর্ববর্তী ঋণ এবং বর্তমান জ্বালানি সমস্যার কারণে নতুন করে ঋণ করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া চ্যালেঞ্জিং ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারকর রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে জোড় দিতে হবে।

উল্লেখ্য, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। শুরুতে এই বাজেট কাটছাঁট করে সাত লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার চিন্তা ছিল। তবে সুদ পরিশোধ ও ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংক একীভূতকরণে মূলধন সহায়তা, সরকারি চাকরিজীবীদের বিভিন্ন ভাতা বাড়ানোর পাশাপাশি নানা ক্ষেত্রে সরকারের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন আর বড় ধরনের কাটছাঁটের পরিকল্পনা নেই।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: