বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের প্রায় এক তৃতীয়াংশই তরুণ। জয়-পরাজয়ে তাদের ভোট একটা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি নারী ভোটার ও প্রবাসী পোস্টাল ভোটারদের ভোটও জয়-পরাজয়ের বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীরও নজর তরুণদের ভোটে। সেই ভোট নিজেদের বাক্সে ফেলতে নানা কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে দলগুলো। নতুন এই ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহের কমতি নেই, তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।
জাতীয় যুবনীতি ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সের সব নাগরিককে ‘যুব’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তবে, নির্বাচন কমিশনের বয়সভিত্তিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের সংখ্যাই এখন প্রায় পাঁচ কোটি। মোট ভোটারের একটি বড় অংশ জুড়ে এই তরুণ প্রজন্মের অবস্থান। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ এবং সচেতন এই ভোটাররা যেদিকে ঝুঁঁকে পড়বেন, ভোটের নাটাই সেদিকেই ঘুরবে। শহর থেকে গ্রাম— সর্বত্রই তরুণ ভোটারদের আধিপত্য বাড়ছে। বিশেষ করে নতুন অন্তর্ভুক্ত হওয়া ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্খা প্রবল।
দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জয়-পরাজয়ের সমীকরণ বদলে দিতে পারে ‘তরুণ শক্তি’। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা এখন প্রায় পাঁচ কোটি। বিশাল এই জনশক্তিই আগামীর ক্ষমতার লড়াইয়ে প্রধান ‘কিংমেকার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে অভ্যস্ত ও সচেতন এই প্রজন্ম প্রার্থীদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। যা চূড়ান্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে।
নতুন এই ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহের কমতি নেই, তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে। দশ বছর আগে ভোটার হয়েছেন তুনাজ্জিনা জাহান। ভোটার হওয়ার পর আওয়মী লীগের শাসনে দুটি একতরফা, বিতর্কিত নির্বাচন দেখেছেন মিজ জাহান; ভোটকেন্দ্রেই যাননি তিনি। এখন এই তরুণীর বয়স আঠাশ বছর। বয়স অনেকটা এগিয়ে গেলেও এবার নতুন ভোটার হিসেবে ভোট দিতে পারবেন বলে মনে করছেন তিনি। প্রথম ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা পাওয়ার অপেক্ষায় এখন তুনাজ্জিনা জাহান। তিনি আলোকিত স্বদেশকে বলেন, যারা মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে ও দুর্নীতি বিরোধী অবস্থান নিবে, তাদের বাক্সেই ব্যালট ফেলবেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় চার কোটি ৩২ লাখ। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। জানা গেছে, এবারের নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে বিএনপি ও তাদের পুরোনো জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী।
এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপিও রয়েছে ভোটের মাঠে। তারা অবশ্য জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে শরিক হয়েছে। রাজনীতির নতুন বিন্যাসে তরুণদের ভোট কোনদিকে যাবে, সেটা আগে থেকেই ধারণা করা যাচ্ছে না বলে বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তবে তাদের ধারণা, তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্ত জয়-পরাজয়ের সমীকরণে প্রভাব ফেলবে।
এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, বড় একটি অংশের তরুণ ভোটার গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। ফলে অনেক তরুণের কাছেই এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের দৃশ্যমান ভূমিকা। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতায় তরুণ ভোটাররা রাজনৈতিকভাবে সচেতন, সেইসাথে তারা তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়। এছাড়া তারা দ্রুত মত বদলাতে সক্ষম এবং সামাজিক প্রভাবের দিক থেকেও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক এগিয়ে। মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘তরুণদের সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। এর বাইরে যে তরুণ জনগোষ্ঠী আছে তারাও হাওয়া বদলে দিতে পারে। তাই বলা মুশকিল তরুণরা শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবে।’
ঢাবি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ঋদ্ধি দাস জানান, আমি অতীত দেখলে প্রার্থীর অতীত দেখবো। তারা আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো পূরণ করেছে কিনা। কথার সাথে কাজের মিল আছে কিনা। ভবিষ্যতে তারা আমাদের জন্য কী করবে সেটাকেই আমি প্রাধান্য দিব। মূলত, কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে, শিক্ষা কতটা কর্মমুখী হবে, দক্ষতা কিভাবে বাড়বে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক হবে, মতপ্রকাশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেইসাথে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান- এই বিষয়গুলো তরুণদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইসি সূত্রমতে, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে তরুণরা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, মতামত জানাচ্ছেন এবং সমালোচনা করছেন।
এবারে প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আগ্রহী মেহেরিন আফছানা বলেন, ‘আমরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে একজন প্রার্থীর সব বিষয়টা জানতে পারছি। তার পারসোনাল লাইফে কেমন, তার ওপর বিশ্বাস রাখা যায় কিনা। যে প্রার্থী তরুণদের চাওয়া পাওয়াকে প্রাধান্য দেবে, যার ব্যাকগ্রাউন্ড ক্লিন আমি তাকেই ভোট দেবো। সে যে দলেরই হোক।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামীণ ভোটারদের আচরণ ও সিদ্ধান্ত এখনও ভিন্ন বাস্তবতায় পরিচালিত হচ্ছে। সেখানকার তরুণ তরুণীদের বড় অংশ পরিবারের প্রবীণ সদস্য, স্বামী, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সংগঠনের বেঁধে দেয়া সিদ্ধান্তের পথেই চলেন।
তরুণদের নিয়ে বিএনপির কৌশল
দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনের মাঠে সক্রিয়ভাবে ফিরেছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে দলটি এবার গুরুত্ব দিচ্ছে ইতিবাচক রাজনীতি ও ভবিষ্যতমুখী প্রতিশ্রুতির ওপর। তরুণ ভোটারদের টানতে বিএনপি স্লোগানও ঠিক করেছে, ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, ধানের শীষের পক্ষে হোক।’ এই লক্ষ্য সামনে রেখে দলের শীর্ষ নেতারাও তরুণদের উদ্দেশে একাধিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
পাশাপাশি আইটি পার্ক ব্যবহার করে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য অফিস স্পেস বরাদ্দ, প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই সুবিধা, এবং ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ের অর্থ দেশে আনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা দূর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
দক্ষ ও যোগ্য তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, বাস্তবমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ বাড়ানোর কথাও জানিয়েছে বিএনপি। তরুণদের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে দলটি তাদের ভ্যারিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত থিম সং, ফটো কার্ড, ভিডিও ও রিলস প্রকাশ করছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন কোনোভাবেই অপপ্রচার, গুজব বা ‘অপরাজনীতির’ হাতিয়ার না হয়, সে বিষয়েই দলের মূল নজর বলে জানিয়েছেন বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার-প্রচারণায় বিএনপি কোনো অপতথ্য, অপপ্রচার বা চরিত্রহননের সঙ্গে থাকবে না। আমরা দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক রাজনীতি করতে চাই। দলের ভালো দিক, নীতি ও পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরাই বিএনপির লক্ষ্য। তরুণদের কাছে আমাদের বার্তা, আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বাস্তবসম্মত সংস্কার চাই।
তরুণদের উদ্দেশে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি
সাম্প্রতিক বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াত-শিবিরের প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় রাজনৈতিক চাপে থাকা জামায়াতে ইসলামী এবারের নির্বাচনকে তাদের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের সুযোগ হিসেবে দেখছে। ভোটের প্রচারে জুলাইয়ের চেতনাকে প্রাধান্য দেয়ার পাশাপাশি ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করছে।
দলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে নিয়মিত কনটেন্ট আপলোড করে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে জামায়াত। জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের পলিসি ডায়ালগে তরুণদের জন্য দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।
যার মধ্যে রয়েছে পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে প্রশিক্ষণ, ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ গঠন, জেলা পর্যায়ে জব ইয়ুথ ব্যাংক গঠন, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলা এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য উপযোগী স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করা। জামায়াতে ইসলাম মূলত কল্যাণমূলক রাজনীতির কথা বলে তরুণদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে।
এনসিপির বড় ভরসা তরুণদের ভোটে
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের অংশ নিতে যাচ্ছে নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নেতৃত্ব ও প্রার্থীদের বড় অংশই তরুণ। ফলে তাদের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণদের প্রত্যাশা। নির্বাচনের মাঠে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে মাঠপর্যায়ের কর্মসূচির পাশাপাশি এনসিপি সোশ্যাল মিডিয়াকে অন্যতম প্রচার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে।
ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স এবং টিকটকে ভিডিও কনটেন্ট, গ্রাফিকস ও লাইভ কার্যক্রম চালাচ্ছে দলটি। র্যাপ, ফোক ও আধুনিক সুরের মিশ্রণে থিম সং, শর্ট ভিডিও ও লাইভ কনটেন্ট ও রিলস প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জেন–জি প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তারা।
এ বিষয়ে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বলেন, আমরা গণভোটে হ্যা এর পক্ষে আর শাপলা কলি নিয়ে দুটো থিম সং করেছি। এই দুটো গান নিয়ে রিলস কম্পিটিশন করা হবে যেন তরুণদের মুখে মুখে গানটা থাকে। আর ৩০টি আসনের প্রার্থীদের নিয়ে আলাদা ভিডিও করে সোশ্যার মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে। যেন তরুণরা আমাদের বিষয়ে জানতে পারে।