রংপুরের তারাগঞ্জে যমুনেশ্বরী ও চিকলী নদীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও নেতাদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ড্রেজার ও ভেকু মেশিন বসিয়ে রাত ৯টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত এসব পয়েন্টে বালু তোলা হচ্ছে। এতে ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেচ প্রকল্প, একটি গুচ্ছগ্রাম, দুটি সেতু, নদীতীরবর্তী বসতভিটা ও কৃষিজমি হুমকির মুখে পড়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার খোলাইঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চিকলী নদী থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। উত্তোলনস্থলের কাছেই রয়েছে একটি গুচ্ছগ্রাম, বদরগঞ্জ-তারাগঞ্জ-সৈয়দপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ওপর নির্মিত দুটি সেতু এবং প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেচ প্রকল্প।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তলদেশ থেকে নির্বিচারে বালু তোলার কারণে বিভিন্ন স্থানে পাড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এভাবে উত্তোলন চলতে থাকলে নদীতীরবর্তী বসতবাড়ি ও কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্পটি। শুষ্ক মৌসুমে এ প্রকল্পের পানি ব্যবহার করে তারাগঞ্জসহ আশপাশের তিন উপজেলার কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা হয়। নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকায় প্রকল্পের স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
খোলাইঘাটের গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা আকালিমা, মোতাহার ও হাবিবুর রহমান জানান, বালু উত্তোলন বন্ধ করতে তাঁরা একাধিকবার প্রশাসনের কাছে আবেদন করেছেন। কিন্তু তাতেও কাজ হয়নি। তাঁদের আশঙ্কা, নদীর পাড় ভেঙে গেলে গুচ্ছগ্রামটি বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় নেতা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় লাখ লাখ টাকার বালু তুলে বিক্রি করা হচ্ছে।
ধোলাইঘাটের কৃষক মোতালেব হোসেন বলেন, নদীর পাড়ে তাঁর কয়েকটি আম ও কাঁঠালগাছ ছিল। বালু তোলার কারণে পাড় ধসে গাছগুলো নদীতে চলে গেছে। এখন আবার ভেকু দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে তাঁর কৃষিজমিও হুমকির মুখে পড়েছে।
খোলাইঘাট বাজারের ব্যবসায়ী মহসিন, আকবর আলী ও ভ্যানচালক খাদিমুল হক জানান, এর আগেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদী থেকে বালু তুলেছেন। বর্তমানে আবারও প্রকাশ্যে এ কার্যক্রম চলছে। অবিলম্বে বালু উত্তোলন বন্ধ করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু খোলাইঘাট নয়, কুর্শা ইউনিয়নের রহিমাপুরের চাকলা, হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের কাশিয়াবাড়ী, নেকিরহাট, খারুভাজ, উজিয়াল, সয়ার, ঠাকুরটারি ও মুচিপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানেও যমুনেশ্বরী নদী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এসব এলাকায় দিন ও রাত—দুই সময়েই বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
আলমপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, এভাবে বালু উত্তোলন চলতে থাকলে সেতু, গুচ্ছগ্রাম ও সেচ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত এ কার্যক্রম বন্ধ করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে তারাগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা উল হুসনা বলেন, বালু উত্তোলনের অভিযোগ পেলেই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, অভিযোগ পাওয়ার পর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তারাও বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
তবে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা গভীর রাতে ও দুর্গম এলাকায়, এমনকি পার্শ্ববর্তী উপজেলার সীমানায় গিয়ে বালু তোলেন। এ ধরনের অপরাধ বন্ধে স্থানীয় প্রশাসন, গ্রাম পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে মামলা করারও আহ্বান জানান তিনি।