মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নির্মাণকাজ। কুতুবপুর, চান্দেরচর ও আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর কলাতলা-নিলখী সেতুর নির্মাণকাজ মাঝপথে বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়া নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনটি সেতুর কোনোটিরই নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। কোথাও নদীর মধ্যে নির্মিত পিলার দাঁড়িয়ে থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কাজের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। আবার কোথাও জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগে জমির মালিকদের বাধার মুখে পড়েছে নির্মাণকাজ। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এসব অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগী জমির মালিকদের অভিযোগ, তাঁদের জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিষ্পত্তি না করেই নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে। পরে বিভিন্ন দপ্তরে যোগাযোগ করেও তাঁরা প্রত্যাশিত সমাধান পাননি। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
কুতুবপুর সেতু: মেয়াদ শেষ, অগ্রগতি মাত্র ৪০ শতাংশ
শিবচরের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোর একটি কুতুবপুর সেতু। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের অক্টোবরে। প্রায় ৯০ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজের মেয়াদ ২০২৫ সালের অক্টোবরে শেষ হয়েছে। তবে মেয়াদ শেষ হলেও কাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ।
সেতুটির কয়েকটি পিলার নদীর মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকলেও নির্মাণকাজের অগ্রগতি থমকে আছে। ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি নির্মিত হলে এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় বিকল্প ঝুঁকিপূর্ণ সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে তাঁদের। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও নিয়মিত যাতায়াতকারীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
চান্দেরচর সেতু: তিন ইউনিয়নের মানুষের দুর্ভোগ
শিবচরের চান্দেরচর বাজারসংলগ্ন এলাকায় নির্মাণাধীন আরেকটি সেতুর কাজও দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। প্রায় ৬৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের নভেম্বরে। প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ১০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেতুটির নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৫০ শতাংশ। জমির ক্ষতিপূরণ না পাওয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে মামলা চলমান থাকায় কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে বলে জানা গেছে।
চান্দেরচর বাজারের সঙ্গে আশপাশের জনপদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে সেতুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উমেদপুর, ভদ্রাসন, কুতুবপুর ও কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের বাসিন্দারা এ পথ ব্যবহার করেন। সেতুর কাজ বন্ধ থাকায় বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। অস্থায়ী ও বিকল্প পথ ব্যবহার করতে গিয়ে যানবাহনচালক ও যাত্রীদের ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী কুদ্দুস মাদবর বলেন, “চান্দেরচর বাজার একটি পুরোনো হাট। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। কিন্তু সেতুর কাজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আমাদের চলাচল ও পণ্য আনা-নেওয়ায় মারাত্মক কষ্ট হচ্ছে। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, দ্রুত যেন এই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করা হয়।”
ভ্যানচালক কামাল হোসেন বলেন, “এই পথে গাড়ি চালাতে গিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত কষ্ট করতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি ও বর্ষা মৌসুমে সেতুর সার্ভিস সড়কে পানি উঠে যায়। ফলে গাড়ি চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। মাঝেমধ্যে চালক ও যাত্রীরা দুর্ঘটনার শিকার হন।”
চান্দেরচর সেতুসংলগ্ন জমির মালিকদেরও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। জমির মালিক ওয়াহেদ মৃধার ছেলে আলমগীর মৃধা বলেন, “আমাদের জমি অধিগ্রহণের টাকা এখনো পাইনি। কিছুদিন আগে কাগজ হাতে পেয়েছি। আমরা চাই সেতু হোক, কিন্তু তার আগে আমাদের ক্ষতিপূরণ বুঝিয়ে দেওয়া হোক।”
স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা সেতু নির্মাণের বিরোধিতা করছেন না। বরং জমি অধিগ্রহণের নিয়ম মেনে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার দাবি জানাচ্ছেন।
কলাতলা-নিলখী সেতু: কাজ বন্ধ, অনিশ্চয়তায় প্রকল্প
আড়িয়াল খাঁ নদের ওপর নির্মাণাধীন কলাতলা-নিলখী সেতুটিও ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতায় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এলজিইডির তত্ত্বাবধানে প্রায় ৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬৭০ মিটার দীর্ঘ ও ৯ দশমিক ৮৩ মিটার প্রস্থের সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধের কারণে সেতুটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বিভিন্ন তথ্যে সেতুটির নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৩৫ শতাংশের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেতুটি নির্মিত হলে শিবচর ও রাজৈর উপজেলার মধ্যে যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি রাজৈর, টেকেরহাট বন্দর এবং গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর থেকে শিবচরে যাতায়াতের দূরত্বও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা। এতে কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণে সুবিধা বাড়বে।
কিন্তু জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেই সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। স্থানীয়দের দাবি, জমির ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা অধিগ্রহণের আওতাভুক্ত জমিতে নির্মাণকাজ চালাতে দিতে চান না।
ভুক্তভোগী জমির মালিকদের পক্ষে আফজাল শিকদার বলেন, “এ এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ক্ষতিগ্রস্ত জমিগুলো সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হলে অন্তত ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে সেই আশাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান মেলেনি।”
প্রশাসনের বক্তব্য: অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, সেতু নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ও কাগজপত্র জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ সম্পন্ন না হওয়ায় নির্মাণকাজ এগিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে। ভূমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই নির্মাণকাজ শুরু করায় জমির শ্রেণি, মূল্য নির্ধারণ ও মালিকানাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে।
শিবচর উপজেলা প্রকৌশলী মো. ইমন মোল্লা বলেন, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে তিনটি সেতুর নির্মাণকাজ দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষও দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। জটিলতা নিরসন হলে বন্ধ থাকা নির্মাণকাজ আবার শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তাঁরা। প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে সার্বক্ষণিক চেষ্টা চলছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় কিছু জমির প্রকৃতি ও নদীর সীমানা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এ কারণে অধিগ্রহণের কাজ কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে আরও জানা গেছে, ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে জমির শ্রেণি, মূল্য নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে নির্মাণকাজ স্বাভাবিক গতিতে চালানো কঠিন।
এদিকে স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনিক কার্যক্রম ও ঠিকাদারি ব্যবস্থাপনায় তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তাও কোনো কোনো প্রকল্পের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ ও প্রশাসনিক অনুমোদনসংক্রান্ত জটিলতাকেই কাজের বিলম্বের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেতুগুলোর কাজ বন্ধ থাকার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে প্রকল্পভিত্তিক নথিপত্র, কাজ বন্ধ হওয়ার সময়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা এবং ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সেতু তিনটি নির্মিত হলে শিবচর ও আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় সেই সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকাবাসী।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদারি জটিলতা এবং কাজ শেষ করার সময়সীমা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে বিষয়টি কেবল যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িত সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও।