যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কার পর আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাফল্য দেখিয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ লক্ষ্যেই উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে আবারও আলোচনার উদ্যোগ নিতে পারেন তিনি। তবে কিমকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের ছাড় দিতে হলে এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হতে পারে।
সিউল, টোকিও ও ওয়াশিংটনভিত্তিক কূটনৈতিক সূত্র এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নীতি বাস্তবায়নে কংগ্রেসের বাধার মুখে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পররাষ্ট্রনীতিতে বেশি মনোযোগী হতে পারে। বিশেষ করে ইউক্রেন ও ইরানের যুদ্ধ বন্ধে তাঁর উদ্যোগগুলো এখনো প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়ায় এশিয়ায় নতুন কূটনৈতিক সম্ভাবনা খুঁজতে পারেন তিনি।
সিউলের কোরিয়া ন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক বান কিল-জুর মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়লে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সাফল্য তুলে ধরার চেষ্টা বাড়াতে পারেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজের পছন্দের উত্তরসূরিকে বিজয়ী করার রাজনৈতিক লক্ষ্যও তাঁর সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ওয়াশিংটনের এমন উদ্যোগে এখনই সাড়া দেওয়ার মতো যথেষ্ট কারণ পিয়ংইয়ংয়ের নেই।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি ইমেইলে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন। তাঁর পররাষ্ট্রনীতি প্রচলিত রাজনৈতিক হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় নিরাপত্তা ও মার্কিন জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার পর দুই নেতার মধ্যে তিনবার বৈঠক হয়েছিল। তবে ২০১৯ সালের বহুল আলোচিত শীর্ষ সম্মেলনে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি এবং দেশটির ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে কোনো সমঝোতা হয়নি। ফলে আলোচনা কার্যত ব্যর্থ হয়।
সাত বছর পর পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এ সময়ে উত্তর কোরিয়া নিজেদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে দেশটির সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে কিমের ওপর আগের মতো চাপ নেই। এ অবস্থায় তাঁকে আলোচনায় ফেরাতে ওয়াশিংটনকে আরও বড় ধরনের ছাড় দিতে হতে পারে।
ব্যক্তিগতভাবে কিম জং উনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশংসা করে আসছেন ট্রাম্প। উত্তর কোরীয় নেতাকে তিনি অসাধারণ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং দুজনের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়া রয়েছে বলেও দাবি করেছেন।
তবে মার্কিন ও দক্ষিণ কোরীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি বছরে দুই নেতার বৈঠকের সম্ভাবনা খুবই কম। চলতি মাসে চীনে অনুষ্ঠেয় আঞ্চলিক শীর্ষ সম্মেলনের আগে পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো ইঙ্গিত পায়নি ওয়াশিংটন।
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জংও সম্প্রতি এক বিবৃতিতে আলোচনার বিষয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, সংলাপ শান্তির পথ হতে পারে, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনায় বসার প্রয়োজন দেখছে না পিয়ংইয়ং। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুতাপূর্ণ নীতির সমালোচনা করেন তিনি। ক্রিপ্টোকারেন্সি প্ল্যাটফর্ম বিন্যান্স থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি ভার্চুয়াল সম্পদ চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।
এর আগে কিম জং উন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগের জন্য চাপ দেওয়া বন্ধ করে, তাহলে আলোচনায় ফেরার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের মতো মার্কিন মিত্ররা উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবস্থান মেনে নেওয়ার বিষয়টি সহজে গ্রহণ করবে না।
সিউলের এহওয়া ওম্যান্স ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লিফ-ইরিক ইজলি সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত মেনে নিয়ে কোনো শীর্ষ বৈঠক হলে তা এশিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থাকে দুর্বল করতে পারে। এতে ওয়াশিংটন, সিউল ও টোকিওর মধ্যে নীতিগত মতবিরোধ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাপানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, বেইজিং ও মস্কোর নীরব সমর্থন নিয়ে ট্রাম্প যদি সরাসরি কিমের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেন, তাহলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান নিজেদের কূটনৈতিকভাবে কোণঠাসা মনে করতে পারে। বিশেষ করে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের শর্ত থেকে ট্রাম্প সরে আসতে পারেন—এমন আশঙ্কা জাপানি কর্মকর্তাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ট্রাম্প ইতিমধ্যে একাধিকবার উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে দেশটির হাতে পারমাণবিক অস্ত্র ও পরমাণু জ্বালানির মজুত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা কৌশলগত কারণে উত্তর কোরিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়নি।
জাপানের সোফিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কাজুহিরো মায়েশিমার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার আলোচনায় ওয়াশিংটন যদি পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অবস্থান মেনে নেয়, তাহলে এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অঞ্চলটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় এটি হতে পারে অন্যতম বড় পরিবর্তন। ট্রাম্প প্রশাসনের বাকি মেয়াদেই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে কিমের সামরিক সক্ষমতাও অনেক বেড়েছে। দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, হাইপারসনিক গ্লাইড যান, আধুনিক যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন ও উন্নত ড্রোন সক্ষমতা বাড়িয়েছে উত্তর কোরিয়া। ফলে কিমকে আলোচনার টেবিলে ফেরাতে হলে শুধু আংশিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাই যথেষ্ট নাও হতে পারে। এর চেয়েও বড় কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক ছাড়ের প্রয়োজন হতে পারে।
তবে সিউলের ইয়নসেই ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মুন চুং-ইনের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত মার্কিন কংগ্রেস এবং তাঁর হাতে থাকা সীমিত সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মুনের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব হিসাব-নিকাশ। ট্রাম্প মেয়াদের শেষ দিকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন এবং কংগ্রেসে প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবেন না—এমন ধারণা কিমের মধ্যে তৈরি হলে আলোচনায় বসার তেমন কোনো কারণ দেখবে না পিয়ংইয়ং।
সূত্র: রয়টার্স