ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বন্ধুত্বে ফাটল?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক ধাক্কা

2026-11-05T15:57:49+00:00
2026-11-05T18:46:30+00:00
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ভোটের মাঠে বিপর্যয়
ক্ষমতা হারানোর শঙ্কা: ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর বন্ধুত্বে ফাটল?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ৩:৫৭ পিএম  আপডেট: ০৫.১১.২০২৬ ৬:৪৬ পিএম
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
নির্বাচনি হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের চাপে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে ট্রাম্পকে। অন্যদিকে ইসরাইলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার কঠিন সমীকরণে পড়েছেন নেতানিয়াহু। দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখন একে অপরের ভাগ্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে একসঙ্গে দুই দিক থেকে। নির্বাচনে তার জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এর মধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলকে দেওয়া প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এমন অবস্থান নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

ফরেন পলিসি ও সিএনএনের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত—সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনি জোটের দুর্বলতা, ওয়াশিংটনের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন এবং সামরিক শক্তির ওপর অতিনির্ভরশীলতা—তিনটি বিষয়ই একসঙ্গে চাপে ফেলেছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে।

যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ, বিপাকে ইসরাইল

দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের সামরিক শক্তির অন্যতম প্রধান ভরসা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা। বর্তমানে ওয়াশিংটন প্রতিবছর দেশটিকে প্রায় ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের সঙ্গে করা ১০ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত।

তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঘোষণায় এই সহায়তা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ককে সরাসরি আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে অস্ত্র কেনা, যৌথ গবেষণা ও সামরিক অংশীদারত্বের কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

ট্রাম্পের যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল ও বামপন্থি রাজনীতিকরা ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তাকে অন্যায্য ব্যয়ের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন। ফলে এই সহায়তা বন্ধের বিষয়টি এখন শুধু পররাষ্ট্রনীতির অংশ নয়; মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ফরেন পলিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ এবং ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নটি মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব প্রভাবিত করেছে।

নেতানিয়াহুর জন্য সংকট, আবার সুযোগও

ইসরাইলের সামরিক সহায়তা বন্ধ হলে তার প্রভাব সরাসরি পড়তে পারে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে। হারেৎজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে একাধিক সংঘাতে জড়িয়ে থাকা ইসরাইলের জন্য মার্কিন সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সহায়তা কমে গেলে গোলাবারুদ সংগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি সামরিক ব্যয় সামলানো কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তনের বার্তা ইসরাইলের প্রতিপক্ষ দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর কাছেও ভিন্ন সংকেত দিতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তবে বিষয়টিকে পুরোপুরি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন না কেউ কেউ। হারেৎজের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, নেতানিয়াহুর প্রস্তাবিত ‘সুপার স্পার্টা ইসরাইল’ ধারণার সঙ্গে এই পরিবর্তনের কিছুটা মিল রয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, সামরিক সরঞ্জাম কেনা ও উৎপাদনে ইসরাইলকে আরও স্বনির্ভর করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অস্ত্র উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়ানো।

গত মে মাসে নেতানিয়াহুও বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে সরাসরি সহায়তানির্ভর ব্যবস্থা থেকে অংশীদারত্বের পর্যায়ে নেওয়া প্রয়োজন। তবে যুদ্ধের মধ্যে হঠাৎ মার্কিন সহায়তা বন্ধের ঘোষণা সেই রূপান্তরকে কতটা সহজ করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নির্বাচনে ধাক্কা, তবু শেষ হয়নি নেতানিয়াহুর লড়াই

ইসরাইলের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও এখনই তার রাজনৈতিক অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে না। দেশটির ক্ষমতার সমীকরণ নির্ভর করছে বিরোধী দলগুলোর সরকার গঠনের সক্ষমতার ওপর।

দ্য হিলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুবিরোধী ভোটের শক্তি নির্বাচনে স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু এই শক্তিকে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল সরকারে রূপ দিতে না পারলে নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় থাকার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হবে না।

গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের মতো বিষয় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে আরও জটিল করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইসরাইলের অবস্থান নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে।

ফলে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকা এখন আর কেবল ইসরাইলি ভোটারদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের জনমত, কংগ্রেসের অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিও তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইসরাইলের সরকার পরিবর্তনে বদলাতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের সমীকরণ

ইসরাইলের নির্বাচনের ফল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। নতুন সরকার গঠিত হলে গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, ইরানবিরোধী অবস্থান এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে তিনি ক্ষমতা হারালে ইরানকেন্দ্রিক ইসরাইলি কৌশলেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, ইসরাইলের আরব রাজনৈতিক দলগুলো সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব বিস্তার করতে পারলে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিতর্ক নতুন মাত্রা পেতে পারে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষকদের মতে, সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, ইহুদি-নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলগুলোর অনেকেই আরব দলগুলোর সঙ্গে সরাসরি জোট গঠনে আগ্রহী নয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথ সহজ হচ্ছে না।

ট্রাম্পের নির্বাচনি চাপেই কি বদলাচ্ছে ইসরাইলনীতি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নির্বাচনি রাজনীতির মধ্যে যোগসূত্র ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। ইরান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং ইসরাইলকে বিপুল সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি মার্কিন ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে।

যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। একটি হিসাব অনুযায়ী, এর প্রভাবে গড়ে একটি মার্কিন পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে প্রায় দুই হাজার ডলার। ফলে যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্যও রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ট্রাম্পের নির্বাচনি চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এতদিন নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের দৃঢ় সমর্থন ছিল। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত দুই নেতার সম্পর্কের পুরোনো সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এমনকি ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও এই ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য হিলের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর অতিমাত্রায় ট্রাম্পনির্ভর কূটনৈতিক কৌশল স্বল্পমেয়াদে সামরিক সুবিধা এনে দিলেও যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের দ্বিদলীয় সমর্থন দুর্বল করেছে। বিশেষ করে তরুণ, স্বতন্ত্র ও ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমছে।

একটি জরিপে ৫৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা কমানো অথবা বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইসরাইলের নিরাপত্তাগত নির্ভরশীলতার কথা বিবেচনায় নিলে এই জনমত নেতানিয়াহুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

নেতানিয়াহুর সামনে কঠিন দুই পথ

ফরেন পলিসি ও দ্য হিলের বিশ্লেষণে নেতানিয়াহুর সামনে দুটি সম্ভাব্য পথের কথা উঠে এসেছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করে সামরিকভাবে আরও স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা। এ ক্ষেত্রে অস্ত্র উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় জোর দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সমর্থন কমে যাওয়া, আন্তর্জাতিক চাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অর্থনৈতিক ও সামরিক বোঝা তাকে আরও কোণঠাসা করে তুলতে পারে। নির্বাচনে জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো এই সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।

সব মিলিয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু এখন নিজ নিজ দেশের নির্বাচনি বাস্তবতার মুখোমুখি। একজনকে সামলাতে হচ্ছে মার্কিন ভোটারদের অসন্তোষ, অন্যজনকে ক্ষমতা ধরে রাখার জটিল হিসাব। এর প্রভাব শুধু দুই নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইরান-ইসরাইল সংঘাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনি চাপের মুখে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক নতুন কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়, নাকি দুই নেতার রাজনৈতিক সংকট মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

তথ্যসূত্র: ফরেন পলিসি, সিএনএন, দ্য হিল, হারেৎজ ও ব্লুমবার্গ।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: