প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) খুলনায় আসছেন তারেক রহমান। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। সড়ক, সড়কদ্বীপ, বিভিন্ন স্থাপনা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেয়াল সাজানো হয়েছে নতুন রূপে। নগরজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে খুলনাবাসীর প্রত্যাশাও বেড়েছে। দীর্ঘদিনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকের বিস্তার রোধ, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পরিবেশবান্ধব পর্যটনশিল্পের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও পর্যটন উদ্যোক্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বদলে গেছে খুলনা মহানগরীর চিরচেনা চিত্র। সড়কের পাশ থেকে অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। সড়কদ্বীপে লাগানো হয়েছে ফুলের গাছ, সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়েছে সড়ক বিভাজনগুলোর। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে স্থান পেয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, ষাট গম্বুজ মসজিদ, মোংলা বন্দর, পাটকল, এ অঞ্চলের খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, শিল্পী এবং ইতিহাস-ঐতিহ্যের নানা চিত্র। গ্রাফিতি ও রংতুলির ছোঁয়ায় বদলে গেছে নগরীর বিভিন্ন এলাকার দৃশ্যপট।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর উদ্যোগে নগরীর পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যবর্ধনে নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড়, সড়ক বিভাজন ও বিভিন্ন স্থাপনায় সাজসজ্জার কাজ শেষ হয়েছে। সব মিলিয়ে সবুজ ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে খুলনাকে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
দীর্ঘদিনের অবহেলা ও শিল্প-অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশা করছেন রূপসা ও ভৈরব নদীর তীরের এই শিল্পনগরীর বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে খুলনার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবনের বিষয়গুলো নতুন গুরুত্ব পাবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সফরসূচি অনুযায়ী, ৫ নভেম্বর সকালে তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে মোংলা বন্দরে পৌঁছাবেন তারেক রহমান। সেখানে মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় দুটি নতুন কনটেইনার জেটি নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক সুবিধা সম্প্রসারণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন তিনি। এ ছাড়া ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ ও ‘চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন’-এর মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর।
পরে সড়কপথে বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হজরত খানজাহান আলী (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে দুপুরে খুলনা সার্কিট হাউসে পৌঁছানোর কথা রয়েছে তাঁর।
বিকেল ৩টায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধন করবেন তিনি। কর্মসূচি শেষে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকার উদ্দেশে খুলনা ত্যাগ করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।
খুলনাবাসীর প্রত্যাশা
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও নগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘গত ১৭ বছর ধরে খুলনা অঞ্চল চরম অবহেলার শিকার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে আমরা নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে দেখছি। খুলনার বন্ধ কলকারখানা চালু, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর সমাধান চাই আমরা।’
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। খেলাধুলাকে দেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়ে নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সূচনা খুলনা থেকে হওয়ায় তিনি আনন্দিত। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে নগরীকে পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন করে সাজানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক মোল্লা খাইরুল ইসলাম জানান, এটি শুধু একটি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা নয়, বরং নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদ তৈরির একটি উদ্যোগ। জেলা স্টেডিয়ামের ভেতরে ও বাইরে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিশু-কিশোর অংশ নেবে।
নিরাপত্তা ও শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর সফর নির্বিঘ্ন করতে নগরজুড়ে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা। স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ), পুলিশ, র্যাব ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, সড়ক ও কর্মসূচিস্থল ঘিরে চলছে নজরদারি।
৫ নভেম্বরের সফর সামনে রেখে প্রস্তুতির শেষ পর্যায়ে রয়েছে খুলনা। নগরীর সড়ক, দেয়াল, মোড় ও বিভিন্ন স্থাপনায় এসেছে নতুন রূপ। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা শুধু প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধনেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁরা চান, খুলনা যেন সারা বছরই পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও কর্মচঞ্চল নগরী হিসেবে গড়ে ওঠে। বন্ধ শিল্পকারখানা চালু, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পর্যটনশিল্পের বিকাশের মধ্য দিয়ে খুলনা ফিরে পাক তার হারানো অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য।