দীর্ঘদিন অনুমতি ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ও সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছে সরকার। একই দিনে তাঁর সঙ্গে আরও ছয় পুলিশ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অসদাচরণের অভিযোগে এক সহকারী পুলিশ সুপারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের পৃথক প্রজ্ঞাপনে এসব শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে জারি করা আদেশগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন। তাঁর বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা এবং ইমেইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কর্মস্থলে ফেরেননি।
এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরে ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। অভিযোগের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি কোনো লিখিত জবাব দেননি, এমনকি জবাব দেওয়ার জন্য সময়ও চাননি।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় গত ২২ জুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। ৬ আগস্ট জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(গ) বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ‘পলায়ন’-এর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এরপর ২০ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি জবাব দেননি।
চাকরি থেকে বরখাস্তের মতো গুরুদণ্ড দেওয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত চায় সরকার। গত ১ অক্টোবর কমিশন হারুনকে বরখাস্তের সুপারিশ করে। বিভাগীয় মামলার নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও পিএসসির মতামত পর্যালোচনার পর ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন। তাঁর বরখাস্তের আদেশ ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। বরখাস্ত আরও ছয় কর্মকর্তা
হারুন-অর-রশীদের পাশাপাশি চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়া অন্য ছয় কর্মকর্তা হলেন—রাজশাহী রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি মো. আনিসুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি শ্যামল কুমার মুখার্জী, লক্ষ্মীপুরের সাবেক পুলিশ সুপার তারেক বিন রশিদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর হাছান, ডিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান সরকার এবং ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সহকারী পুলিশ সুপার ফারহানা তাসকিন।
প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট নথির তথ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অমান্য করা এবং দেশের বাইরে অবস্থান করে কর্মস্থলে ফিরে না আসার মতো অভিযোগ আনা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক বিভাগীয় তদন্তের পর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে ফারহানা তাসকিন ও মো. মনিরুজ্জামান সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে দেশের বাইরে অবস্থানের অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে এস এম জাহাঙ্গীর হাছান নৌ পুলিশের টাঙ্গাইল অঞ্চলে কর্মরত থাকাকালে ১৫ দিনের বহিঃবাংলাদেশ ছুটি নিয়ে ২০২৪ সালের ৮ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগ করেন। পরে আরও ৬০ দিনের ছুটি বাড়ানোর আবেদন নাকচ হলেও তিনি কাজে যোগ দেননি। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে পলায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়।
এদিকে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের সাবেক সহকারী কমিশনার কাজী মিজানুর রহমানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তিনি পরবর্তী সময়ে সিআইডির দিনাজপুর জেলায় কর্মরত ছিলেন।
বিভাগীয় অভিযোগে বলা হয়, ২০২২ সালের এপ্রিলে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কনস্টেবলের স্ত্রীর সঙ্গে ফেসবুকের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় হয়। পরে ওই নারীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে। বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধি অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে অসদাচরণের দায়ে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে চাকরি থেকে বরখাস্ত না করে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার সুপারিশে পিএসসির মতামত নেওয়া হয় এবং ২৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এক দিনে পুলিশের সাত কর্মকর্তার চাকরির অবসান এবং একজনের বাধ্যতামূলক অবসরের আদেশ কার্যকর হলো।