শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে রাজধানীর বাজারে উঠতে শুরু করেছে নতুন মৌসুমের সবজি। সরবরাহ বাড়ায় কোনো কোনো বাজারে কমেছে শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন সবজির দাম। তবে দাম কমার এই চিত্রে স্বস্তি ফিরছে না সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে। কারণ, বাজারভেদে অধিকাংশ সবজির দাম এখনো কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। দেশি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত। নতুন আলুর দামও কোনো কোনো বাজারে ১৬০ টাকা কেজি।
অন্যদিকে, মাছ-মাংস ও ডিমের বাজারেও খুব একটা সুখবর নেই। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬২০ থেকে ৬৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মাছের বাজারে আগুন। ফলে সবজি, মাছ ও মাংস কিনতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সীমিত আয়ের মানুষ।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও অন্যান্য বাজার ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা যায়, শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় কিছু পণ্যের দাম কমেছে। তবে সব বাজারে একই হারে দাম কমেনি। বাজার ও পণ্যের মানভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে।
বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি দেশি টমেটো ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেটে দেশি টমেটোর দাম ১৮০ থেকে ২২০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। সাধারণ টমেটো পাওয়া যাচ্ছে ১২০ টাকায়। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি।
শিমের দাম বাজারভেদে ৭০ থেকে ১০০ টাকা। বেগুন ৬০ থেকে ১২০ টাকা, শসা ৮০ থেকে ১২০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১০০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়স ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ঝিঙা ও ধুন্দল ৮০ থেকে ১০০ টাকা, বরবটি ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং মুলা ৪০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
ফুলকপি ও বাঁধাকপির দাম তুলনামূলক কম। আকারভেদে ফুলকপি ৪০ থেকে ৮০ টাকা এবং বাঁধাকপি ৩০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পটোল ৫০ থেকে ৬০ টাকা, কচুমুখী ৪০ থেকে ৮০ টাকা এবং মিষ্টিকুমড়া ৪০ থেকে ৫০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
তুলনামূলক কম দামে মিলছে পেঁপে। বাজারভেদে প্রতি কেজি পেঁপে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। আলু ২৫ টাকা এবং পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে নতুন আলুর দাম বাজারভেদে অনেক বেশি। কোথাও ৮০ টাকা, আবার কোথাও ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে।
চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে কাঁচা মরিচও। বাজারভেদে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১৪০ টাকা।
মাছের বাজারে সবচেয়ে বেশি দামের চাপ বড় আকারের ও সামুদ্রিক মাছের ক্ষেত্রে। তুলনামূলক কম দামে পাঙাশ ২০০ থেকে ২৩০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া রুই মাছ ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, কাতল ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা, পাবদা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, চাষের শিং ৩৫০ থেকে ৬০০ টাকা এবং টেংরা ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বড় আকারের মাছের মধ্যে আইড়ের দাম ৭০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা, বোয়াল ৬৫০ থেকে ৮০০ টাকা, বাইন মাছ ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বড় চিংড়ি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। দেশি শিং মাছ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে।
মাছ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, সামুদ্রিক ও দেশি মাছের দাম তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে, ক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, বাজারভেদে মাছের দামে পার্থক্য থাকলেও তাজা মাছ কিনতে গেলে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
মুরগির বাজারে গত সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্য স্বস্তি নেই। বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ২৯০ থেকে ৩৩০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি প্রায় ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগির দাম ৬২০ থেকে ৬৭০ টাকা পর্যন্ত।
ডিমের বাজারে প্রতি ডজন লাল বা বাদামি ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা এবং সাদা ডিম ১৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। হাঁসের ডিমের ডজন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। বাজারভেদে দেশি মুরগির ডিমের হালি ১০০ টাকা এবং সোনালি মুরগির ডিমের হালি ৭০ টাকা।
মাংসের বাজারেও দাম চড়া। প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বিক্রেতাদের দাবি, শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় পাইকারি বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমেছে। সেই প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়ছে। তবে পরিবহন ব্যয়, পাইকারি ক্রয়মূল্য এবং পণ্যের মানের কারণে সব বাজারে একই দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে না।
সবজি বিক্রেতা আকাশ রহমানের ভাষ্য, পাইকারি বাজার থেকে যে দামে সবজি কিনতে হচ্ছে, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে সে অনুযায়ী বিক্রি করতে হচ্ছে। সরবরাহ ও মানের পার্থক্যেও দামের তারতম্য হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাজার করতে আসা ক্রেতাদের অভিযোগ, কিছু সবজির দাম কমলেও অধিকাংশ পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মাছ, মুরগি ও ডিম কিনতেও উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে অনেকেই প্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমিয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে, মাছের বাজার নিয়ে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর রাজধানীর বাজারে ইলিশের চাহিদা বেড়েছে। বিক্রেতাদের দাবি, এবার ডিমওয়ালা ইলিশ বেশি ধরা পড়েছে। তবে আগামী কয়েক দিনের বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই দামের গতিপ্রকৃতি বোঝা যাবে।
অন্যদিকে, বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিছু সবজির দাম ১০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। বিশেষ করে শিম, টমেটো, বেগুন ও কাঁচা মরিচের দাম কমার প্রবণতা রয়েছে। তবে সব পণ্যের দাম কমেনি।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বাজারে শীতকালীন সবজির আগমন এবং সরবরাহ বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করলেও মাছ, মাংস ও বেশ কিছু সবজির উচ্চমূল্য ক্রেতাদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ আরও বাড়লে দাম কমতে পারে বলে আশা করছেন বিক্রেতারা। তবে সেই স্বস্তির অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদের।