আসন্ন পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, রমজানকে কেন্দ্র করে বাজারে পণ্যের সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই। একই সঙ্গে আপাতত ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলেও স্পষ্ট করেছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বৈঠকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ, আমদানি পরিস্থিতি, বাজার স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
এ সময় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান নাসির উদ দৌলাসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আমদানিকারক ও ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও চিনিসহ রমজানে চাহিদা বেড়ে যায়—এমন আমদানিনির্ভর পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি সরকার পর্যালোচনা করেছে। সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে আমদানির পাইপলাইনে পর্যাপ্ত পণ্য রয়েছে। ফলে রমজানের আগে কিংবা রমজান চলাকালে বাজারে এসব পণ্যের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা নেই।
তিনি বলেন, পাইপলাইনে থাকা পণ্যের পরিমাণ বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য যথেষ্ট। সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে সরকার পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম, জাহাজভাড়া ও আমদানি ব্যয়ের ওঠানামা দেশের বাজারে মূল্য নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এ কারণে আমদানির পরিস্থিতি ও বাজারের চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রমজানের আগে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই মুহূর্তে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য পরিস্থিতি এবং আমদানি ব্যয়ের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হয়।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে ছোলার দাম কিছুটা বেড়েছে বলে জানান মন্ত্রী। বিষয়টি নিয়ে আমদানিকারকদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। রমজানে ছোলা, ডাল, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের চাহিদা বাড়তে পারে বলে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা কোনো সমস্যায় পড়ছেন কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।
তবে কোনো আমদানিকারক এলসির মার্জিন কিংবা ব্যাংকিং জটিলতার মুখে পড়লে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমদানি কার্যক্রমে বাধা তৈরি হলে তা পণ্যের সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে—এ বিবেচনায় সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া প্রথম দফার আলোচনা দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে বলে আশা করছে সরকার।
তিনি বলেন, আলোচনা এগিয়ে নিয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, নিউজিল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গেও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে এ ধরনের চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সরকারের লক্ষ্য হলো, একদিকে রমজানকে সামনে রেখে অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে রপ্তানি ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি করা।