বিমানবন্দর ঘিরে অবৈধ সোনার বানিজ্য

শাকিল আহমেদ

বাণিজ্য

দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে সক্রিয় অবৈধ সোনার বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক। দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সদস্যরা হযরত শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী

2026-10-27T12:25:55+00:00
2026-10-27T12:25:55+00:00
  মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,
১১ কার্তিক ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বাণিজ্য
বিমানবন্দর ঘিরে অবৈধ সোনার বানিজ্য
শাকিল আহমেদ
মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৫ পিএম 
প্রতীকী ছবি
দেশের তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে সক্রিয় অবৈধ সোনার বাণিজ্যের নেটওয়ার্ক। দেশি-বিদেশি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের সদস্যরা হযরত শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সোনা চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। চক্রগুলোর সদস্যরা কখনো যাত্রীর ছদ্মবেশে, কখনো উড়োজাহাজের আসন কিংবা শৌচাগারে সোনা লুকিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে। তবে পাচারের সময় তারা নানা কৌশলে নিরাপত্তাব্যবস্থার চোখ ফাঁকি দিচ্ছেন।

মাঝেমধ্যে কাস্টমস ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অভিযানে উদ্ধার হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সোনা। তবে চালান উদ্ধার হলেও এর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং পুরো নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব সোনা কারা পাঠাচ্ছে, দেশে পৌঁছানোর পর কার হাতে যাচ্ছে, আর এর সঙ্গে বিমানবন্দরের কোনো অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে চোরাচালানবিরোধী অভিযান ও তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন।
 

শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী বিমানবন্দরকে ঘিরে চোরাচালানের নেটওয়ার্ক!নেপথ্যের কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে

গত রোববার চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জেদ্দা থেকে আসা এক যাত্রীর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় দেড় কেজি সোনার চুড়ি। শুল্ক-করসহ এসব সোনার মূল্য প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর কয়েক দিন আগে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুই যাত্রীর শরীরের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় দুই কেজির বেশি সোনার পেস্ট। এর আগে উড়োজাহাজের আসন, শৌচাগার ও বিমানকর্মীদের জুতা থেকেও উদ্ধার হয়েছে কোটি কোটি টাকা মূল্যের সোনা।

একটির পর একটি চালান ধরা পড়ছে। বাহক হিসেবে আটক হচ্ছেন যাত্রী ও বিমানকর্মীরা। হচ্ছে মামলা, চলছে তদন্ত। কিন্তু এসব ঘটনায় সোনার উৎস, অর্থের জোগানদাতা, মধ্যস্থতাকারী এবং দেশে নির্ধারিত গ্রহীতাদের কতজন শনাক্ত হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র প্রকাশ্যে নেই। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু সোনা উদ্ধারের সাফল্য নয়; দেশের তিন বিমানবন্দরকেন্দ্রিক চোরাচালানের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

ব্যাগ থেকে জুতা, বদলাচ্ছে পাচারের কৌশল : গত ২৫ অক্টোবর শাহ আমানত বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৩৬ ফ্লাইটে জেদ্দা থেকে চট্টগ্রামে আসেন মো. শরীফ। তাঁর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় গোয়েন্দা সংস্থা ও কাস্টমসের কর্মকর্তারা তল্লাশি চালান। তাঁর হ্যান্ডব্যাগ ও পরনের পোশাক থেকে উদ্ধার করা হয় ৪৯টি সোনার চুড়ি। ওজন প্রায় দেড় কেজি। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে চোরাচালান আইনে মামলা হয়েছে। এর আগে ১৮ অক্টোবর একই বিমানবন্দরে আবুধাবি থেকে আসা এক যাত্রীর ব্যাগে থাকা ফ্রাইং প্যান ও সবজি কাটার যন্ত্রের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ৪৬৬ গ্রাম সোনার বার। তাঁর কাছে থাকা আরও ১০০ গ্রাম সোনার চুড়িসহ মোট ৫৬৬ গ্রাম সোনা জব্দ করা হয়। একই দিনে শাহজালাল বিমানবন্দরে মালদ্বীপ থেকে আসা দুই যাত্রীর শরীরের ভেতরে লুকানো ছয়টি সোনার পেস্ট উদ্ধার করা হয়। এসবের মোট ওজন ২ কেজি ৭৩৪ গ্রাম, বাজারমূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। একই দিনে দুই বিমানবন্দরে ভিন্ন কৌশলে সোনা উদ্ধারের ঘটনা দেখায়, চোরাচালানের চেষ্টা শনাক্ত করতে তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব চালানের মধ্যে যোগসূত্র আছে কি না, তা কেবল কৌশলের মিল দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ।

উড়োজাহাজের ভেতরেও নিরাপদ নয় সোনা : গত ৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা এমিরেটসের একটি ফ্লাইটের পর দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় ৮০টি সোনার বার। ওজন প্রায় ৯ দশমিক ৩৪ কেজি, বাজারমূল্য প্রায় ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই বিমানকর্মীকে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠান। পরে তাঁদের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুর থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজের শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয় ৫০টি সোনার বার। ওজন ৫ দশমিক ৮৩২ কেজি, বাজারমূল্য প্রায় ১১ কোটি টাকা। গত ২ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের একটি উড়োজাহাজের ১৯-এ আসনের নিচে কালো টেপে মোড়ানো ৮০টি সোনার বার পাওয়া যায়। ওজন ৯ দশমিক ৩৩১ কেজি, বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর আগে ২ জুলাই শাহজালালে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গো অংশ থেকে উদ্ধার করা হয় ১৬০টি সোনার বার, যার ওজন ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম। উড়োজাহাজের আসন, শৌচাগার কিংবা কার্গো অংশে সোনা পাওয়া গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এসব জায়গায় চালান পৌঁছাল কীভাবে? সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটে কারা প্রবেশ করেছিলেন, পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে কারা ছিলেন, সিসিটিভি ফুটেজে কী পাওয়া গেছে—এসব তথ্য তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে নির্দিষ্ট ঘটনায় কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণ ছাড়া ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

তিন বিমানবন্দর ঘিরে নেটওয়ার্কের অভিযোগ : শাহজালাল, শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের অভিযোগ, এ কারবারে বাহক ছাড়াও দেশ-বিদেশের সরবরাহকারী, মধ্যস্থতাকারী, অর্থদাতা ও সোনা গ্রহণকারীরা যুক্ত থাকতে পারেন। কোথাও কোথাও বিমানবন্দরসংশ্লিষ্ট কর্মীদের সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সব কটির সত্যতা প্রতিষ্ঠিত নয়। চোরাচালানের পুরো চিত্র জানতে হলে শুধু চালান বহনকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করলেই চলবে না। তিনি কোথা থেকে সোনা সংগ্রহ করেছেন, কার নির্দেশে বহন করেছেন, যাতায়াতের ব্যয় কে বহন করেছে এবং দেশে পৌঁছানোর পর কার কাছে চালান হস্তান্তরের কথা ছিল, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের তথ্য, ভ্রমণের ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক যাচাই করা প্রয়োজন। একাধিক মামলায় একই ব্যক্তি, অর্থ লেনদেনের ধরন কিংবা নির্দিষ্ট গন্তব্যের তথ্য পাওয়া গেলে তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে তথ্য-প্রমাণ ছাড়া পৃথক ঘটনাকে একই চক্রের কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না।

নজরদারি জোরদার, তদন্তের ফল কী? ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার মো. রইচ উদ্দিন খান বলেন, অবৈধ পণ্য ও সোনা পাচার রোধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি কাস্টমসের প্রতিটি দল সর্বোচ্চ দক্ষতা ও সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। অন্যান্য সংস্থাও পাচারকারীদের শনাক্ত ও আটকাতে কাজ করছে। তবে নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি বড় চালান উদ্ধারের পর তদন্ত কত দূর এগোচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কতটি ঘটনায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, মূল পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে কি না, সোনার উৎস ও অর্থের জোগান সম্পর্কে কী তথ্য মিলেছে, এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া চোরাচালানবিরোধী অভিযানের সামগ্রিক কার্যকারিতা মূল্যায়ন কঠিন।

বিশেষ করে উড়োজাহাজের ভেতরে সোনা রেখে যাওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটের নিরাপত্তা যাচাই, কর্মীদের প্রবেশাধিকার, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি এবং নজরদারির রেকর্ড পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোথাও নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘাটতি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে। আবার গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে চালান উদ্ধার হওয়াও প্রতিরোধব্যবস্থার কার্যকারিতার অংশ। তাই শুধু উদ্ধারসংখ্যা দিয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারণ করা যায় না।

বাহক নয়, পুরো শৃঙ্খল শনাক্ত জরুরি : বিমানবন্দরে সোনা উদ্ধারের পর মামলা, জিজ্ঞাসাবাদ, আলামত পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তদন্তের লক্ষ্য যদি শুধু বাহক শনাক্ত ও সোনা উদ্ধারে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে চোরাচালানের নেপথ্যের কাঠামো অজানাই থেকে যেতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন ঘটনার তথ্য সমন্বয়, আর্থিক লেনদেনের সূত্র অনুসন্ধান, যোগাযোগের যোগসূত্র যাচাই এবং বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থার নিয়মিত পর্যালোচনা। পাশাপাশি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হলে জবাবদিহি বাড়বে। প্রশ্নটি তাই শুধু কত কেজি সোনা উদ্ধার হলো, তা নয়। কারা সোনা সংগ্রহ করছে, কারা পরিবহনের ব্যবস্থা করছে, কারা অর্থ জোগাচ্ছে এবং দেশে পৌঁছানোর পর কারা তা গ্রহণ করছে, এসব প্রশ্নের উত্তরও জরুরি। প্রমাণের ভিত্তিতে পুরো সরবরাহশৃঙ্খল শনাক্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে পারলেই বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: