বিশ্ববাজারে টানা দরপতনের পর স্বর্ণের দামে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম কমে আসায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হারসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। তবে সাম্প্রতিক বড় দরপতনের পর স্বর্ণের বাজারে এই ঘুরে দাঁড়ানো কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট স্বর্ণের দাম প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১০ ডলারের কাছাকাছি লেনদেন হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্যও বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২২ ডলারের ওপরে ওঠে।
এর আগে গত সপ্তাহে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম প্রায় ৪ শতাংশ কমে যায়, যা গত জুনের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক দরপতন। সোমবারের এই সামান্য বৃদ্ধি তাই আপাতত বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি স্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সাম্প্রতিক দরপতনের প্রভাব পড়েছে দেশের স্বর্ণের বাজারেও। বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নতুন দর অনুযায়ী, ২৫ অক্টোবর থেকে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম প্রতি ভরিতে ৩ হাজার ৩২৪ টাকা কমিয়ে ২ লাখ ২০ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সর্বশেষ প্রকাশিত দর অনুযায়ী, অন্যান্য মানের স্বর্ণের দামও কমেছে। ২১ ক্যারেট স্বর্ণের প্রতি ভরি ২ লাখ ১০ হাজার ৯৪৩ টাকা, ১৮ ক্যারেট ১ লাখ ৮১ হাজার ২০০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৪৮ হাজার ১৬ টাকা।
তবে গয়না কেনার সময় নির্ধারিত স্বর্ণের দামের সঙ্গে প্রযোজ্য ভ্যাট ও মজুরি যোগ হতে পারে। ফলে দোকানে ক্রেতাকে চূড়ান্তভাবে যে অর্থ দিতে হবে, তা শুধু ঘোষিত স্বর্ণের দামের সমান নাও হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম কমে আসায় মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। এতে স্বর্ণের বাজারে সাময়িক স্বস্তি তৈরি হয়েছে। তবে সুদের হার নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো স্বর্ণের দামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক।
বাজার বিশ্লেষক কাইল রোডার বলেছেন, তেলের দাম কমে যাওয়ায় স্বর্ণের বাজার কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। তবে ফেডের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত সামনে থাকায় এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা সীমিত হতে পারে।
সাধারণত সুদের হার বেশি থাকলে স্বর্ণের মতো সুদবিহীন সম্পদে বিনিয়োগের আকর্ষণ কমে যায়। বিপরীতে সুদের হার কমার সম্ভাবনা তৈরি হলে স্বর্ণের চাহিদা বাড়তে পারে। এ কারণে ফেডের সিদ্ধান্তের আগে বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
আগামী ২৭ ও ২৮ অক্টোবর ফেডারেল রিজার্ভের নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপর ২৯ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তিগত ভোগব্যয় মূল্যসূচকের (পিসিই) তথ্য প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি বোঝার জন্য এই সূচকটি ফেডের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে চলতি বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার প্রত্যাশা রয়েছে। তবে ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়তে পারে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ফেডের ভবিষ্যৎ নীতির ইঙ্গিতও স্বর্ণের দামে প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমার সম্ভাবনায় সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। তবে সৌদি আরবে হুথিদের হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি কাটেনি। তেলের দাম আবার বাড়লে মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
স্বর্ণের পাশাপাশি সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দামও বেড়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে রুপার দাম প্রায় ০.৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৫৪ ডলারের ওপরে ছিল। অন্যদিকে প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের দামে সামান্য ওঠানামা দেখা গেছে।
সব মিলিয়ে, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম সামান্য বাড়লেও সামনে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে কি না, তা নির্ভর করছে ফেডের সিদ্ধান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতির তথ্য, তেলের বাজার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। দেশের বাজারে স্বর্ণ কিনতে আগ্রহীদেরও পরবর্তী বাজুস ঘোষণার দিকে নজর রাখতে হবে।