অভিন্ন কর ও ভ্যাটের একক হার চালু করতে আগ্রহী এনবিআর

কেএম শরিফ ইমতিয়াজ

বাণিজ্য

রাজস্ব খাত ঢেলে সাজাতে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণে দেশের কর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয়

2026-10-26T11:21:15+00:00
2026-10-26T11:21:15+00:00
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
বাণিজ্য
অভিন্ন কর ও ভ্যাটের একক হার চালু করতে আগ্রহী এনবিআর
নভেম্বরে ঢাকা আসছে আইএমএফের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি
কেএম শরিফ ইমতিয়াজ
সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:২১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
রাজস্ব খাত ঢেলে সাজাতে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণে দেশের কর ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালি-সামগ্রী থেকে শুরু করে শত শত পণ্যে বিদ্যমান হ্রাসকৃত ভ্যাট সুবিধা ও সংবিধিবদ্ধ আদেশের (এসআরও) আওতায় দেওয়া ছাড় তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পরিবর্তে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সব পণ্যে একক বা অভিন্ন ১৫ শতাংশ কর ও ভ্যাটের একক হার চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গণপরিবহনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে এ পরিকল্পনার বাইরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছে সরকার।

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে সব ধরনের কর ও ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) অব্যাহতি সুবিধা। একই সঙ্গে দেশজুড়ে চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে শতভাগ একক ১৫ শতাংশ ভ্যাটহার। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পেতে কিছু শর্ত থাকে। যার মধ্যে রয়েছে কর অব্যাহতি প্রত্যাহার, কর যৌক্তিকীকরণ, কর আদায় প্রক্রিয়া সহজ এবং কর-জিডিপি হার বাড়ানো। সরকার সংস্থাটির সঙ্গে নতুন করে ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে। এ কারণে সংস্থাটির শর্ত অনুযায়ী রাজস্ব খাতে বেশ কিছু সংস্কার করতে হবে। তবে সংস্কারের সময় দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হবে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডে আইএমএফের সম্মলনে অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা পেতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে। আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ঋণের জন্য শর্ত থাকবে এবং তা পূরণও করতে হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো হবে।

জানা যায়, রাজস্ব খাতের সংস্কার প্রস্তাবনা এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সরেজমিনে মূল্যায়নে, আগামী নভেম্বরে আইএমএফের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। ওই সফরে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি রাজস্ব সংস্কারের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হতে পারে। প্রস্তাবিত সংস্কার পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব পণ্যের ওপর থেকে ধাপে ধাপে ছাড় প্রত্যাহার করা হবে এবং সেগুলোকে ১৫ শতাংশ একক ভ্যাট হারের আওতায় নিয়ে আসা হবে। তবে ভ্যাটের ছাড় তুলে একক ১৫ শতাংশ হার চালুর পরিকল্পনাটি এখনও প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। ভ্যাট আইন সংশোধন বা নতুন প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান হারই কার্যকর থাকবে।

এনবিআরের কর্মকর্তারা জানান, নিজস্ব রাজস্ব বাড়ানো ও করছাড়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর বিষয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০৩০ সালের মধ্যে একক ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন ঋণের শর্ত ও সংস্কার বাস্তবায়নের সময়সূচি নিয়ে আলোচনা চলমান; প্রস্তাবগুলো এখনও চূড়ান্ত শর্তে পরিণত হয়নি। তবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে অভিন্ন ভ্যাট হার কার্যকরের প্রস্তাব দেওয়া হলেও কিছু অত্যাবশ্যক পণ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট খাতে ছাড় বহাল রাখা হবে। তথ্য অনুযায়ী, ইলেকট্রিক্যাল-সামগ্রী, ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ও এর আনুষঙ্গিক-সামগ্রী, রড-স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, রেস্তোরাঁ, নন-ব্র্যান্ডের পোশাক, স্যানিটারি ন্যাপকিন ও ডায়াপারের মতো পণ্যে বর্তমানে ৭ দশমিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে ভ্যাট রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ছাড়ের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন বা ২০৩০ সালের জুনে শেষ হলে তা আর নবায়ন না করার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশে উৎপাদিত লিফটের ওপর ২০৩০ সাল পর্যন্ত থাকা ১০ শতাংশ ভ্যাট সুবিধাও আর বাড়ানো নাও হতে পারে। এছাড়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য চালু প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাটব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর কম হারের ভ্যাটও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এসব বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তবে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেক অর্থনীতিবিদদের। তাদের মতে, অতীতের রাজস্ব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ২০৩০ সালের লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির মেয়াদে কী কী সংস্কার হবে এবং করছাড় তুলে কত অতিরিক্ত রাজস্ব আসবে, তার বিশ্বাসযোগ্য হিসাব দিতে হবে। হিসাব অনুযায়ী, দেশে মোট করছাড় জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, বিপরীতে রাজস্ব আদায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে একক ১৫ শতাংশ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনাকে শুধু ভালো বা খারাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা এ পরিবর্তন গ্রহণ করতে পারবে, তা বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।’

ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মতে, একক বা অভিন্ন ভ্যাট হার চালু করা অসম্ভব নয়। তবে এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো ভ্যাটের হার। হার কিছুটা কমিয়ে অভিন্ন ভ্যাট নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়ীদের আপত্তি কমতে পারে। ভ্যাটের ছাড় কমিয়ে একক ১৫ শতাংশ হার চালুর পরিকল্পনায় সরকারের রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের খরচ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর সম্ভাব্য চাপও বিবেচনা করতে হবে। কর ফাঁকি কমানো, করজাল সম্প্রসারণ, বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় খাতে সুরক্ষা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু ভ্যাটের হার বাড়িয়েই প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে। এনবিআরের সর্বশেষ প্রতিবেদন বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ভ্যাট অব্যাহতি ও ছাড়ের কারণে সরকারের রাজস্ব হারানোর পরিমাণ এক লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় তিন দশমিক ৩০ শতাংশ। একই অর্থবছরে প্রকৃত ভ্যাট আদায় ছিল প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। সে হিসেবে, ওই অর্থবছরে ভ্যাট-ছাড়ের বিপরীতে রাজস্ব হারানোর হিসাব প্রকৃত আদায়ের চেয়েও বেশি ছিল। এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের মোট কর অব্যাহতির পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, বিপরীতে রাজস্ব আদায় প্রায় ৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অতীতে রাজস্ব সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলেও আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচির মেয়াদ তার আগেই শেষ হতে পারে। ফলে কর্মসূচির নির্ধারিত সময়ে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব, তার সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: