যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনের কূটনৈতিক তৎপরতায় আশার আলো দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। এর প্রভাবে সোমবার (২৬ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। তবে সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় বাজারে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সোমবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুড ফিউচার্সের দাম ১ ডলার ৭৬ সেন্ট বা ১ দশমিক ৭ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ১০১ ডলার ৫১ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার্সের দাম ১ ডলার ৪৯ সেন্ট বা ১ দশমিক ২৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১১৫ ডলার ২৩ সেন্টে।
তবে দামের এই পতন সত্ত্বেও গত সপ্তাহের উত্থানের প্রভাব রয়ে গেছে বাজারে। শুক্রবার সৌদি আরবে হুথিদের হামলার পর জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে তেলের দাম প্রায় ৩ ডলার বেড়েছিল। সপ্তাহ শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মোট ৬ শতাংশ এবং ডব্লিউটিআইয়ের দাম ২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। ফলে সোমবারের দরপতনকে বড় ধরনের স্বস্তি হিসেবে দেখছেন না বাজার বিশ্লেষকেরা।
উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত কমানোর প্রচেষ্টাই তেলের দাম নিম্নমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত এক কর্মকর্তার বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে তেহরানে যান।
এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সোমবার ইরানের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা ছিল। আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সংঘাতের বিস্তার ঠেকাতে এ ধরনের যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক তৎপরতা এখনো জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতিতে স্থায়ী পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেয়নি।
তেলের দাম কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও পরিবহনপথের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাজারকে অস্থির করে রেখেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বিশ্ববাজারের জন্য বড় উদ্বেগ। এ নৌপথে বিঘ্ন ঘটলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ কমে যেতে পারে, পরিবহন ব্যয় বাড়তে পারে এবং তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা সাময়িকভাবে দাম কমাতে সহায়তা করছে। কিন্তু সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থার ঝুঁকি না কমলে তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো কঠিন হবে।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়েও সতর্কবার্তা দিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরল সোমবার সিঙ্গাপুরে এক শিল্প সম্মেলনে বলেন, ২০২৭ সালে জ্বালানি বাজার ইরান যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে বলে তিনি আশা করেন না।
আইইএর অক্টোবরের তেলবাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ জ্বালানি মূল্য, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। পুরো বছরেও চাহিদা কমার পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হামলা এবং জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তাঝুঁকি সরবরাহ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলছে। ফলে শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের বাজারেও চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমলেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা কতটা এগোয়, সৌদি আরবে হামলা বন্ধ হয় কি না এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জ্বালানি পরিবহন কতটা নিরাপদ থাকে—এসব বিষয়ের ওপরই আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের গতিপথ অনেকাংশে নির্ভর করবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)