চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেঁওচিয়ায় বন গবেষণা কেন্দ্রের ১ হাজার ৮৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৬০০ একরই বেদখলে চলে গেছে। সরকারি এই বিশাল ভূসম্পত্তির বিভিন্ন অংশে গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, মাছের খামার, পোলট্রি ফার্মসহ নানা স্থাপনা। কোথাও গড়ে উঠেছে রোহিঙ্গাদের বসতি। গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রটিতে কার্যক্রমের চেয়ে জমি রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনবল সংকট, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ এবং বন বিভাগের একাংশের বিরুদ্ধে যোগসাজশের অভিযোগে সরকারি সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে।
সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া বাইতুল ইজ্জত এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের আওতাধীন এই গবেষণা কেন্দ্রটি কেঁওচিয়া থেকে পার্শ্ববর্তী ছদাহা ইউনিয়নের সাড়াশিয়া মৌজা পর্যন্ত বিস্তৃত। মোট ১ হাজার ৮৪ একর জমির মধ্যে প্রায় ৬০০ একর ইতোমধ্যে দখলদারদের কবজায় চলে গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দখল হয়ে যাওয়া এসব জমিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা। শুধু দখল করেই ক্ষান্ত হননি কেউ কেউ; দখল করা জমির স্বত্ব হাতবদল ও বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি গবেষণা কেন্দ্রের মূল ক্যাম্পাসের জমিতেও দখলদারদের নজর পড়েছে। কিছু জমি গোপনে নামজারি করে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একটি অংশ এবং বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সরকারি এই সম্পদ দখল করা হয়েছে। গবেষণা কেন্দ্রের হরিণতোয়া অংশসহ বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা বসতি গড়ে উঠেছে বলেও জানান তাঁরা।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইসমাইল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন বিভাগের লোকজনের উদাসীনতা এবং কারও কারও সঙ্গে দখলদারদের আঁতাতের কারণেই সরকারি জমির এমন পরিণতি হয়েছে। তাঁদের মতে, প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া এই বিপুল সরকারি সম্পদ উদ্ধার করা কঠিন।
গবেষণা কেন্দ্রের হরিণতোয়া এলাকায় গড়ে ওঠা তথাকথিত রোহিঙ্গা পাড়াকে ঘিরেও নানা অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, ওই এলাকার সানাউল্লাহ, দিল মুহাম্মদ ও ছিদ্দিকের বিরুদ্ধে মানব পাচার এবং ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, অবৈধ বসতি ও পরিচয়সংক্রান্ত অনিয়মের সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাঁদের দাবি, বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ তারিফুল বারী বলেন, দখলদারদের কোনোভাবেই পুরোপুরি থামানো যাচ্ছে না। মূল ক্যাম্পাসেও দখলদাররা হানা দিয়েছে। জনবল সংকটের কারণে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারি জমি রক্ষায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও জরুরি।
কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের সিলভিকালচার রিসার্চ বিভাগের কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, জবরদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধারে উদ্যোগ নিলেই বিভিন্ন মহল থেকে ফোন আসে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপের মুখেও পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আনিছুর রহমান জানান, ২০১৬ সালে কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রে যোগ দেওয়ার পর থেকে তাঁরা প্রায় ৩০০ একর জমি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামের অভাব এবং প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপের কারণে পুরো গবেষণা কেন্দ্র রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় সংবাদকর্মী বেলাল উদ্দিন মনে করেন, সরকারি বনসম্পদ রক্ষায় দ্রুত উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি অবৈধ দখল শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
সাতকানিয়ার সচেতন মহলের দাবি, কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের বেদখল হওয়া জমি উদ্ধার করে গবেষণা কার্যক্রমের উপযোগী পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। অবৈধভাবে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের পরিচয় ও অবস্থান যাচাই করে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাঁদের নির্ধারিত ক্যাম্পে স্থানান্তরেরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সারা দেশে ২১টি গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ছয়টি—সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া, ফটিকছড়ির হাজারীখিল ও হেঁয়াকো, রাঙ্গুনিয়ার ইছামতি, মীরসরাইয়ের হিংগুলি এবং সীতাকুণ্ডে অবস্থিত। বাকি ১৫টি কেন্দ্র দেশের অন্যান্য জেলায় রয়েছে।
গবেষণার মাধ্যমে বনসম্পদ উন্নয়ন ও সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা এসব কেন্দ্রের। কিন্তু কেঁওচিয়ার মতো একটি গবেষণা কেন্দ্রে শত শত একর জমি বেদখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সম্পদ সংরক্ষণ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ, অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে কেঁওচিয়া বন গবেষণা কেন্দ্রের জমি উদ্ধার করা হবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রটিকে কার্যকর গবেষণাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।