স্ট্রোক এমন একটি জরুরি শারীরিক অবস্থা, যেখানে মস্তিষ্কের কোনো অংশে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় অথবা রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ ঘটে। এতে মস্তিষ্কের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, দেখা দিতে পারে স্থায়ী পঙ্গুত্ব, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। বয়স বৃদ্ধি ও বংশগত ইতিহাসের মতো কিছু ঝুঁকি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের মতো ঝুঁকিগুলো নিয়ন্ত্রণে রেখে স্ট্রোকের আশঙ্কা অনেকটাই কমানো যায়।
চিকিৎসাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং বিদ্যমান রোগের যথাযথ চিকিৎসা। হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিংয়ের পরামর্শের পাশাপাশি আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও আমেরিকান স্ট্রোক অ্যাসোসিয়েশনের নির্দেশনাতেও এসব অভ্যাসের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
১. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি। দীর্ঘদিন রক্তচাপ বেশি থাকলে রক্তনালির ওপর চাপ বাড়ে, নালির ক্ষতি হতে পারে এবং মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা রক্তপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খাবারে অতিরিক্ত লবণ কমানো, নিয়মিত শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া, শরীরচর্চা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে দৈনিক সোডিয়াম ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখা এবং অনেকের ক্ষেত্রে আরও কম গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি মোট লবণের পরিমাণের সমান নয়—সোডিয়াম ও লবণের হিসাব আলাদা।
রক্তচাপ ১২০/৮০ মিমি পারদের নিচে থাকাকে স্বাভাবিক মাত্রা হিসেবে ধরা হয়। তবে ব্যক্তিভেদে চিকিৎসার লক্ষ্য ভিন্ন হতে পারে। তাই একবারের রিডিংয়ের পরিবর্তে নিয়মিত রক্তচাপ মাপা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখুন
অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল ও হৃদ্রোগের সম্পর্ক রয়েছে। এসব সমস্যা একত্রে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ওজন কমানোর জন্য হঠাৎ কঠোর ডায়েট বা না খেয়ে থাকার পরিবর্তে পরিমিত খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য, মাছ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখুন। অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, ভাজাপোড়া এবং উচ্চমাত্রার লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার সীমিত করুন।
ওজন কমানোর লক্ষ্য সবার জন্য এক নয়। বয়স, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগ বিবেচনায় প্রয়োজনীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত।
৩. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
শারীরিক পরিশ্রম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, ওজন কমাতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে স্ট্রোকের সঙ্গে সম্পর্কিত একাধিক ঝুঁকি একসঙ্গে কমানো সম্ভব হয়।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শরীরচর্চা—যেমন দ্রুত হাঁটা বা সাইকেল চালানো—অথবা সমপরিমাণ জোরালো ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করা যেতে পারে।
একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটুন। যাঁরা আগে ব্যায়াম করতেন না, তাঁরা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন। হৃদ্রোগ বা অন্য গুরুতর শারীরিক সমস্যা থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
৪. ধূমপান ও তামাক বর্জন করুন
ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে, রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায় এবং ধমনিতে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এতে মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
সিগারেটের পাশাপাশি অন্যান্য তামাকজাত পণ্য থেকেও দূরে থাকা জরুরি। পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন এবং ধূমপান ছাড়তে প্রয়োজন হলে চিকিৎসক বা তামাক ছাড়ার সহায়তাকারী সেবার পরামর্শ নিন। ভ্যাপিংকেও ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ধূমপান ছেড়ে দিলে সময়ের সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে পারে। আগে থেকেই ধূমপানের অভ্যাস থাকলেও ছাড়ার সিদ্ধান্ত উপকারী।
৫. ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখুন
রক্তে দীর্ঘদিন শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে রক্তনালির ক্ষতি হতে পারে। অন্যদিকে, ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল বেড়ে গেলে ধমনিতে চর্বিজাতীয় আস্তরণ জমে রক্তপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ডায়াবেটিস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের গ্লুকোজ ও প্রয়োজনমতো এইচবিএ১সি পরীক্ষা করুন। কোলেস্টেরলের মাত্রা যাচাই করতে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষাও প্রয়োজন হতে পারে। ফলাফলের ভিত্তিতে চিকিৎসক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও ওষুধের বিষয়ে পরামর্শ দেবেন।
নিজে থেকে ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করা বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। একইভাবে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ প্রয়োজন হলে কেবল খাদ্যাভ্যাসের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
৬. হৃদ্যন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দন শনাক্ত ও চিকিৎসা করান
‘অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন’ বা এএফআইবি হলো হৃদ্যন্ত্রের স্পন্দনের এক ধরনের অনিয়ম। এ অবস্থায় হৃদ্যন্ত্রের ভেতরে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। সেই জমাট রক্ত মস্তিষ্কে পৌঁছালে স্ট্রোক ঘটতে পারে। চিকিৎসা না করা এএফআইবিতে স্ট্রোকের ঝুঁকি স্বাভাবিকের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
বুকে ধড়ফড়ানি, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তবে এএফআইবি অনেক সময় স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াও থাকতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী ইসিজি বা অন্যান্য পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করা হয়।
এএফআইবি শনাক্ত হলে চিকিৎসক হৃদ্স্পন্দন নিয়ন্ত্রণ ও রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি কমানোর জন্য ওষুধ দিতে পারেন। রক্ত পাতলা করার ওষুধ নিজে থেকে শুরু করা বিপজ্জনক; রোগীর অবস্থা ও রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বিবেচনায় চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেবেন।
৭. স্বাস্থ্যকর খাবার খান, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন
খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোক প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত লবণ, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খেলে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, বাদাম, পূর্ণশস্য ও পরিমিত মাছ রাখুন। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত স্ন্যাকস এবং চিনিযুক্ত পানীয় কমিয়ে দিন। খাবারে স্বাদের জন্য অতিরিক্ত লবণের পরিবর্তে লেবু ও বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করা যেতে পারে।
অ্যালকোহল গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং অতিরিক্ত পান করলে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই নিরাপদ পছন্দ। পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সুস্থ জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্ট্রোকের লক্ষণ চিনুন: সময় নষ্ট নয়
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া মস্তিষ্কের ক্ষতি কমাতে এবং জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণগুলো হঠাৎ দেখা দিতে পারে। সহজে মনে রাখার জন্য ‘বিই-ফাস্ট’ (BE FAST) পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়।
বি—ব্যালান্স (Balance): হঠাৎ হাঁটতে সমস্যা, মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো।
ই—আইজ (Eyes): হঠাৎ এক বা দুই চোখে দেখতে সমস্যা হওয়া।
এফ—ফেইস (Face): হাসতে বললে মুখের এক পাশ ঝুলে পড়া।
এ—আর্ম (Arms): দুই হাত তুলতে বললে এক হাত দুর্বল হয়ে নিচে নেমে আসা।
এস—স্পিচ (Speech): কথা জড়িয়ে যাওয়া, অস্পষ্ট কথা বলা বা অন্যের কথা বুঝতে সমস্যা।
টি—টাইম (Time): এসব লক্ষণের কোনোটি দেখা দিলে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
এ ছাড়া হঠাৎ শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, অজানা কারণে তীব্র মাথাব্যথা বা আকস্মিক দৃষ্টির সমস্যা হলেও অবহেলা করা যাবে না।
করণীয়: স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি চিকিৎসাসেবার সাহায্য নিন। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, সময়টি মনে রাখুন। রোগীকে নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যেতে দেবেন না। চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া খাবার, পানীয় বা অ্যাসপিরিন দেবেন না—কারণ স্ট্রোক রক্তনালি বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি রক্তক্ষরণের কারণেও হতে পারে। লক্ষণ কয়েক মিনিট পর সেরে গেলেও জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন; এটি সাময়িক স্ট্রোকের সংকেত হতে পারে।
শেষ কথা
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে একদিনের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্যকর অভ্যাস এবং বিদ্যমান রোগের যথাযথ চিকিৎসা। রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা করানো, ধূমপান বর্জন, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা—এই পদক্ষেপগুলো দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ও হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় সাহায্য করতে পারে। তবে যাঁদের আগে স্ট্রোক হয়েছে বা হৃদ্রোগসহ অন্য ঝুঁকি রয়েছে, তাঁদের ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা চিকিৎসকের সঙ্গে ঠিক করে নেওয়া জরুরি।