একসময় গ্রামবাংলার হাট-বাজারে ঢুকলেই চোখে পড়ত দাঁড়িপাল্লা। দোকানের সামনে ঝুলে থাকা দুই পাল্লায় একদিকে থাকত চাল, ডাল, ধান, লবণ, মসলা কিংবা অন্যান্য পণ্য; অন্যদিকে একের পর এক বাটখারা বসিয়ে ওজন মেলাতেন দোকানি। পাল্লার ওঠানামা আর বাটখারার টুংটাং শব্দ ছিল গ্রামীণ বাজারের অতি পরিচিত দৃশ্য।
কালের বিবর্তনে সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া ও ডিজিটাল-ইলেকট্রনিক ওজনযন্ত্রের ব্যাপক ব্যবহারে প্রাচীন বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের দাঁড়িপাল্লা ও নানা ওজনের লোহা-পাথরের বাটখারা হারিয়ে যেতে বসেছে। একসময় কেনাবেচার অপরিহার্য অনুষঙ্গ হলেও এখন অনেক দোকানের কোণে, পুরোনো ঘরের আলমারিতে কিংবা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে এসব সামগ্রী।
শুধু ওজন মাপার যন্ত্র নয়, লোকজ ঐতিহ্য
দাঁড়িপাল্লা মূলত ভারসাম্যের নীতিতে কাজ করা একটি পরিমাপক যন্ত্র। একটি দণ্ডের দুই পাশে দুটি পাল্লা ঝুলিয়ে এক পাশে পণ্য এবং অন্য পাশে নির্দিষ্ট ওজনের বাটখারা বসানো হতো। দুই পাল্লা সমান হলে নির্ধারিত হতো পণ্যের ওজন।
গ্রামবাংলায় বাঁশ, বেত, কাঠ, পাটের রশি ও ধাতু ব্যবহার করে তৈরি হতো দাঁড়িপাল্লার বিভিন্ন অংশ। গোলাকার পাল্লা তৈরি করতেন বাঁশ-বেতের কারিগররা, কাঠের দণ্ড তৈরি করতেন কাঠমিস্ত্রিরা এবং বিভিন্ন ওজনের বাটখারা তৈরি করতেন কামার ও ধাতুশিল্পীরা। ফলে দাঁড়িপাল্লাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় কারুশিল্পের একটি স্বতন্ত্র ধারা।
শুধু একটি যন্ত্র নয়, দাঁড়িপাল্লা ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও বাজার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাটে-বাজারে পণ্য কেনাবেচা, কৃষকের উৎপাদিত ধান-চাল বিক্রি, মুদি দোকানে নিত্যপণ্য মাপা—সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার ছিল ব্যাপক।
সের, পোয়া, ছটাক থেকে গ্রাম-কিলোগ্রাম
দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারার সঙ্গে বাংলার পুরোনো ওজন ব্যবস্থারও রয়েছে দীর্ঘ সম্পর্ক। একসময় সের, পোয়া, ছটাক, তোলা ও মণসহ বিভিন্ন প্রচলিত এককে পণ্য মাপা হতো। অঞ্চল ও সময়ভেদে এসব এককের প্রচলিত মানে পার্থক্য থাকলেও বাজারের লেনদেনে এগুলোর ব্যবহার ছিল বহুল।
ঔপনিবেশিক আমলে ওজনের মান এক করার উদ্যোগও নেওয়া হয়। পরবর্তীকালে মেট্রিক পদ্ধতি চালুর ফলে গ্রাম ও কিলোগ্রাম ধীরে ধীরে প্রচলিত ওজনের প্রধান এককে পরিণত হয়।
স্বর্ণালংকারের ব্যবসায় আবার সূক্ষ্ম ওজনের জন্য ব্যবহৃত হতো বিশেষ ধরনের দাঁড়িপাল্লা ও ক্ষুদ্র ওজন। স্বর্ণকারদের কাজে রতি-ভিত্তিক ওজন ব্যবস্থারও প্রচলন ছিল। ফলে দাঁড়িপাল্লা শুধু কৃষি ও নিত্যপণ্যের বাজারেই নয়, মূল্যবান ধাতুর ব্যবসাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
হাটের প্রাণ ছিল বাটখারার টুংটাং
কয়েক দশক আগেও গ্রামের ছোট মুদি দোকান থেকে শুরু করে বড় হাটের ব্যবসায়ীদের কাছে দাঁড়িপাল্লা ছিল অপরিহার্য। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, চিনি, লবণ, মসলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন কৃষিপণ্য মাপা হতো এই যন্ত্রে।
ক্রেতা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দেখতেন—এক পাল্লায় পণ্য উঠছে, অন্য পাল্লায় বসানো হচ্ছে ৫০ গ্রাম, ১০০ গ্রাম, ২৫০ গ্রাম, ৫০০ গ্রাম কিংবা এক কেজির বাটখারা। পাল্লা সমান হলেই মিলত কাঙ্ক্ষিত ওজন।
বাটখারার সঙ্গে দাঁড়িপাল্লার সেই টুংটাং শব্দ ছিল গ্রামীণ হাট-বাজারের এক বিশেষ আবহ। আজকের প্রজন্মের কাছে যা কেবল পুরোনো স্মৃতি, কয়েক দশক আগেও সেটিই ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা।
ডিজিটাল মেশিনে বদলে গেছে বাজার
সময়ের সঙ্গে বাজার ব্যবস্থায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। দ্রুত ওজন নির্ণয়, সহজ হিসাব এবং সময় বাঁচানোর কারণে ব্যবসায়ীরা এখন ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক স্কেলের ওপর বেশি নির্ভর করছেন।
ডিজিটাল মেশিনে কয়েক সেকেন্ডেই পণ্যের ওজন জানা যায়। অনেক যন্ত্রে একই সঙ্গে পণ্যের মূল্যও হিসাব করা সম্ভব। ফলে দোকানদারকে আর পাল্লা ঝুলিয়ে বাটখারা মিলিয়ে ওজন নির্ধারণ করতে হয় না। ক্রেতাও মেশিনের ডিসপ্লেতে সরাসরি ওজন দেখতে পারেন।
এ কারণে শহর থেকে গ্রাম—প্রায় সর্বত্রই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিয়েছে আধুনিক ওজনযন্ত্র। নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের কাছে দ্রুততা ও সুবিধাই এখন বড় বিষয়। ফলে দাঁড়িপাল্লা-বাটখারার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই কমছে।
হারাচ্ছেন ঐতিহ্যের কারিগররাও
দাঁড়িপাল্লার ব্যবহার কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগরদের জীবনেও। বাঁশ-বেতের কারিগর, কাঠমিস্ত্রি, কামার ও ধাতুশিল্পীদের একটি অংশ একসময় দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চাহিদা কমে যাওয়ায় নতুন প্রজন্মের অনেক কারিগর আর এই কাজ শিখতে আগ্রহী হচ্ছেন না। ফলে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে শুধু একটি ওজন মাপার যন্ত্র নয়, এর সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কারুশিল্প ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দক্ষতাও।
এখনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন কেউ কেউ
তবে পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা। দেশের কিছু প্রত্যন্ত এলাকায় এখনো প্রবীণ ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ ঐতিহ্যবাহী এই পদ্ধতি ধরে রেখেছেন।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কাঞ্চনা ইউনিয়নের বকশিখীল গ্রামের প্রবীণ ব্যবসায়ী সৈয়দ হোসেন তাদেরই একজন। পৈতৃক পেশা ও পুরোনো স্মৃতি ধরে রাখতে তিনি এখনো ঐতিহ্যবাহী দাঁড়িপাল্লা ও পাথরের বাটখারা ব্যবহার করে কৃষিপণ্য কেনাবেচা করেন।
তার ভাষ্য, দাঁড়িপাল্লা শুধু ওজন মাপার যন্ত্র নয়; এর সঙ্গে মিশে আছে বাংলার বাজার সংস্কৃতি ও গ্রামীণ অর্থনীতির দীর্ঘ ইতিহাস।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার হাইলধর গ্রামের প্রবীণ রফিকুল ইসলামও স্মরণ করেন সেই সময়ের কথা। তার ভাষায়, আগে চাল, আটা কিংবা অন্যান্য পণ্য মাপার সময় বাটখারার টুংটাং শব্দে গ্রামীণ হাট-বাজার মুখর থাকত। এখন ডিজিটাল মেশিনের দাপটে সেই পরিচিত শব্দ ও দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে।
পটিয়ার আমির ভান্ডার এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা শুধু পণ্য মাপার উপকরণ ছিল না, এগুলো ছিল গ্রামীণ হাটের সংস্কৃতির অংশ। এখন কোথাও কোথাও পুরোনো দাঁড়িপাল্লা দেখা গেলেও তা আর আগের মতো নিয়মিত কাজে ব্যবহৃত হয় না।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে?
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ডিজিটাল মেশিনে দ্রুত ওজন মাপা যায় এবং একই সঙ্গে হিসাব করাও সহজ। আধুনিক বাজারব্যবস্থায় সময় বাঁচানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ায় মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী পরিমাপকগুলোর ব্যবহার অনেক কমে গেছে।
প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তাদের মতে, আধুনিক ওজনযন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও পুরোনো দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য আলাদা করে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ
দাঁড়িপাল্লা ও বাটখারা হয়তো আধুনিক যুগে দ্রুততম ওজন মাপার মাধ্যম নয়। কিন্তু বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। একসময়কার হাট-বাজার, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, পণ্য বিনিময় ও স্থানীয় কারুশিল্পের সঙ্গে এসব সরঞ্জাম নিবিড়ভাবে যুক্ত।
প্রবীণ প্রজন্মের কাছে দাঁড়িপাল্লা-বাটখারা কেবল একটি পুরোনো যন্ত্র নয়; এটি গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি। তাই পুরোনো দাঁড়িপাল্লা, বাটখারা ও সংশ্লিষ্ট কারুশিল্প সংগ্রহ করে স্থানীয় জাদুঘর, ঐতিহ্যকেন্দ্র কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্য ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই ঐতিহ্য একসময় শুধু লোকসংস্কৃতির জাদুঘরের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই; তবে সেই অগ্রযাত্রার সঙ্গে অতীতের গুরুত্বপূর্ণ স্মারকগুলো সংরক্ষণ করাও জরুরি।
একসময় যে দাঁড়িপাল্লার দুই পাল্লায় মাপা হতো বাংলার মানুষের নিত্যদিনের জীবন-জীবিকা, সেই পাল্লা আজ আর আগের মতো ওঠানামা করে না। বাজারে শোনা যায় না বাটখারার সেই চেনা টুংটাং শব্দ। আধুনিকতার স্রোতে দাঁড়িপাল্লা-বাটখারা হারিয়ে গেলেও বাংলার লোকজ ইতিহাসে এগুলোর স্থান থেকে যাবে—গ্রামীণ অর্থনীতি, বাজার সংস্কৃতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হয়ে।