মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনে আলো-আঁধারির লড়াইয়ের মধ্যেই জমে উঠেছে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সকালে সাদমান ইসলামের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি, এরপর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে ধস—দিনের চিত্রনাট্যে ছিল দুই বিপরীত দৃশ্য। ২৭২ রানে স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস শেষ হওয়ার পর বল হাতে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। জন ক্যাম্পবেলের ফিফটির পর তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিনে চাপে পড়েছে ক্যারিবীয়রা। তবে বৃষ্টি ও আলোকস্বল্পতার কারণে দ্বিতীয় দিনেও নির্ধারিত সময়ের আগেই খেলা শেষ করতে হয়েছে।
দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংসে সংগ্রহ ৪ উইকেটে ১৩৪ রান। বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনো ১৩৮ রানে পিছিয়ে ক্যারিবীয়রা। হাতে রয়েছে ৬ উইকেট। ফলে তৃতীয় দিন দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে—বাংলাদেশ চাইবে দ্রুত বাকি উইকেট তুলে নিতে, আর ওয়েস্ট ইন্ডিজের লক্ষ্য থাকবে ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
প্রথম দিনের শেষ বিকেলে আলোকস্বল্পতার কারণে খেলা বন্ধ হওয়ার সময় ৯৯ রানে অপরাজিত ছিলেন সাদমান ইসলাম। বৃহস্পতিবার সকালে মাঠে নেমেই সেই অপেক্ষার অবসান ঘটান তিনি। দিনের দ্বিতীয় বলেই দুই রান নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের তৃতীয় সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন বাঁহাতি এই ওপেনার। ১৭ ইনিংস পর তিন অঙ্কের দেখা পেলেন সাদমান।
তবে সেঞ্চুরির আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ১০৫ রানে জশুয়া বিশপের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন তিনি। রিভিউ নিয়েও সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেনি বাংলাদেশ। ২৩৪ বলের ইনিংসে ১১টি চার মারেন সাদমান। তাঁর এই ইনিংসই বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের প্রধান ভিত্তি হয়ে থাকে।
আগের দিনের ৩ উইকেটে ২১৩ রান নিয়ে দ্বিতীয় দিন শুরু করেছিল বাংলাদেশ। সাদমানের বিদায়ের পর দ্রুত ভেঙে পড়ে স্বাগতিকদের ইনিংস। ২২১ রানে চতুর্থ উইকেট হারানোর পর আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি দল।
আগের দিন পেশিতে টান লাগায় ৪২ রানে রিটায়ার্ড হার্ট হয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন তাওহিদ হৃদয়। সাদমান আউট হওয়ার পর ফিরে এসে আর রান যোগ করতে পারেননি তিনি। বিশপের বলে বোল্ড হয়ে ফেরেন হৃদয়। এরপর মেহেদী হাসান মিরাজ ১৫ রান করে জোমেল ওয়ারিক্যানের শিকার হন।
নাঈম হাসান, হাসান মাহমুদ, তাইজুল ইসলাম ও শরীফুল ইসলামও ব্যাট হাতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেননি। শেষ সাত উইকেট হারাতে বাংলাদেশ যোগ করে মাত্র ৫৯ রান। ৯৭.৪ ওভারে ২৭২ রানে শেষ হয় প্রথম ইনিংস। লিটন দাস ৩৪ রানে অপরাজিত থাকেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে বাঁহাতি স্পিনার জোমেল ওয়ারিক্যান ৫৩ রানে ৫ উইকেট নেন। শামার জোসেফ পান ২ উইকেট, আর অভিষিক্ত জশুয়া বিশপ নেন ২ উইকেট।
২৭৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুতে স্বস্তিতেই ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তবে ২৯ রানে ব্র্যান্ডন কিংকে ফিরিয়ে প্রথম সাফল্য এনে দেন হাসান মাহমুদ। উইকেটরক্ষক জাকের আলী অনিকের হাতে ক্যাচ দিয়ে ১৫ রানে ফেরেন কিং। লিটন দাস চোট পেয়ে মাঠ ছাড়ায় এদিন উইকেটের পেছনে দায়িত্ব পালন করেন জাকের।
এরপর জন ক্যাম্পবেলকে দুবার ফেরানোর সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি বাংলাদেশ। প্রথমবার নাঈম হাসান ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে ডাইভ দিয়েও ক্যাচ ধরতে পারেননি। পরে শরীফুল ইসলাম কট অ্যান্ড বোল্ডের সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেন। জীবন পেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং চালিয়ে যান ক্যাম্পবেল। তুলে নেন নিজের ষষ্ঠ টেস্ট ফিফটি।
তবে শেষ পর্যন্ত মেহেদী হাসান মিরাজের বলে স্লিপে নাজমুল হোসেন শান্তর দুর্দান্ত ক্যাচে বিদায় নিতে হয় তাঁকে। ক্যাম্পবেলের উইকেট বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি হয়ে আসে।
ক্যাম্পবেল ফেরার পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপর চাপ আরও বাড়ান বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। একই ওভারে কাভেম হজ ও আমির জাঙ্গুকে ফিরিয়ে দেন তিনি। হজ করেন ৭ রান, আর জাঙ্গু কোনো রান না করেই সাজঘরে ফেরেন।
একপর্যায়ে ৩৬ ওভারে ৪ উইকেটে ৯৭ রানে নেমে যায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ। তাতে বাংলাদেশের সামনে ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়। তবে তেজনারায়ণ চন্দরপল ও পরের ব্যাটারদের প্রতিরোধে ইনিংস সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে সফরকারীরা।
চন্দরপল ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত চাপ ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যান। দিন শেষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১৩৪ রান তুললেও বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে এখনো অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের খেলায় সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় আবহাওয়া ও আলো। দুপুরের দিকে আলোকস্বল্পতার কারণে ফ্লাডলাইট জ্বালাতে হয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই চা-বিরতি দেওয়া হয়। এরপর বৃষ্টি নামলে মাঠ ঢেকে দেওয়া হয় কাভার দিয়ে।
বৃষ্টি থামার পর মাঠকর্মীরা কাভার সরিয়ে নিলেও আলো পর্যাপ্ত না থাকায় খেলা শুরু করা যায়নি। প্রায় ৭৮ মিনিট বিরতির পর বিকেল ৩টা ১৮ মিনিটে আবার খেলা শুরু হয়। কিন্তু শেষ বিকেলে আলো আবার কমে আসে। আম্পায়াররা লাইট মিটার দিয়ে আলো পরীক্ষা করে খেলা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথম দিনের মতো দ্বিতীয় দিনেও আলোকস্বল্পতার কারণে নির্ধারিত সময়ের আগে খেলা শেষ হওয়ায় ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে। টেস্টে এমন পরিস্থিতিতে ব্যাটিং ও বোলিংয়ের পরিকল্পনাও প্রভাবিত হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসে ব্যাটিংয়ের সময় ডান কনুইয়ে আঘাত পান লিটন দাস। পরে তাঁকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে দলের ফিজিওর বরাতে জানানো হয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে জাকের আলী উইকেটরক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। লিটনের চোটের অবস্থা এবং পরবর্তী সময়ে তিনি কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারবেন, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান বাংলাদেশের প্রত্যাশা পূরণ না করলেও বোলাররা ম্যাচে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছেন। বিশেষ করে তাইজুল ও মিরাজের স্পিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঝের সারিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এখন দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে সফরকারীদের লিড নেওয়া ঠেকানোই হবে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য।
অন্যদিকে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ চাইবে হাতে থাকা ছয় উইকেট কাজে লাগিয়ে প্রথম ইনিংসের ব্যবধান কমাতে। চন্দরপল ও গ্রিভসের মতো ব্যাটারদের জন্য তৃতীয় দিনের শুরুটা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাদমানের সেঞ্চুরি, বাংলাদেশের ব্যাটিং ধস, ক্যারিবীয়দের প্রতিরোধ আর বারবার আলো কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিন ছিল ঘটনাবহুল। এখন দেখার বিষয়, তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের বোলাররা কত দ্রুত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস গুটিয়ে দিতে পারেন এবং স্বাগতিকরা ম্যাচে কতটা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।