আগাম বন্যার প্রভাব, বিলের পানি দ্রুত নেমে যাওয়া ও জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের সংকটে পড়েছে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি শিল্প। মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে কাঁচামালের দাম। এতে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন নাটোরের সিংড়া উপজেলার শুঁটকি ব্যবসায়ীরা। পর্যাপ্ত কাজ না পাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদেরও।
নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে অবস্থিত চলনবিল একসময় দেশীয় মিঠাপানির মাছের প্রাচুর্যের জন্য পরিচিত ছিল। বর্ষার পানি নামার পর বিলের পাড়ে শুরু হয় শুঁটকি তৈরির ব্যস্ততা। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়। শুঁটকি উৎপাদন ও বিক্রির আয় দিয়ে চলে অনেক পরিবার।
তবে চলতি মৌসুমে গত বছরের তুলনায় বিলে মাছের প্রাপ্যতা কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শুঁটকি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচা মাছ সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। বেশি দামে মাছ কিনতে হওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। কিন্তু বাড়তি খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিক্রির দাম না বাড়ায় মুনাফা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরাও রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। মাছের সরবরাহ কম থাকলে উৎপাদন কমে যায়, আর উৎপাদন কমলে কাজের সুযোগও সংকুচিত হয়। এতে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চলনবিলের শুঁটকির সুনাম রয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। প্রতিবছর বিভিন্ন এলাকা থেকে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতারা এখানে শুঁটকি কিনতে আসেন। ক্রেতাদের মতে, চলনবিলের শুঁটকির গুণগত মান ভালো। তবে এবার মাছের সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে দাম কিছুটা বেশি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সিংড়া উপজেলায় ২৫০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে মৎস্য বিভাগ। গত বছরও একই লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং তা অর্জিত হয়। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন শুঁটকিপল্লিতে উৎপাদন শুরু হয়েছে। তবে কাঁচা মাছের সরবরাহ কম থাকায় এ বছরও লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
সিংড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, গত বছর উপজেলায় ২৫০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং তা অর্জিত হয়েছে। চলতি বছরেও একই লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। উৎপাদন শুরু হলেও মাছের সরবরাহ কিছুটা কম থাকায় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। সরবরাহ বাড়লে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি আরও জানান, মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ এবং দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণন উপযোগী শুঁটকি তৈরিতে মৎস্য অধিদপ্তর কাজ করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিলের দেশীয় মাছের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা এবং শুঁটকি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবিকা রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। মাছের সরবরাহ বাড়ানো, উৎপাদনব্যবস্থার উন্নয়ন ও বাজারজাতকরণে সহায়তা না বাড়লে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আরও সংকটে পড়তে পারে।