মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও চাঁদপুরের মেঘনা নদীতে বন্ধ হচ্ছে না ইলিশ শিকার। মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার নদী এলাকায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মা ইলিশ ধরার অভিযোগ উঠেছে। শুধু রাতের আঁধারে মাছ শিকারই নয়, ভোর থেকে বিভিন্ন ঘাট ও বাজারে প্রকাশ্যে সেই মাছ বিক্রিরও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে, নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নদীতে মাছ ধরতে নৌকাপ্রতি ২০ হাজার টাকা দিয়ে ‘টোকেন’ সংগ্রহ করতে হয় বলে কয়েকজন জেলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও নৌ-পুলিশকে ম্যানেজ করেই তারা নদীতে নামছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং কথিত টোকেন বাণিজ্যে কারও সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বলছেন, জনবল সংকটের মধ্যেও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রশাসনের অভিযান ও তৎপরতা দেখা গেলেও সন্ধ্যার পর নদীতে বাড়ে জেলেদের আনাগোনা। বিকেল ৫টার পর অভিযান পরিচালনাকারীদের উপস্থিতি কমে গেলে নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন একাধিক জেলে। রাতভর জাল ফেলে মাছ শিকারের পর ভোরে নদীর তীরবর্তী ঘাট ও বাজারে নেওয়া হয় সেই মাছ। সেখানে পাইকারদের কাছে তা বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার হরিনা ফেরিঘাট, আনন্দবাজার, দাসাদি ও লালপুর বাজারে মা ইলিশ প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী, নীলকমল ও গাজীপুর এলাকাতেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
লালপুর বাজারের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ীর দাবি, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই তারা মাছের ব্যবসা করছেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে বিভিন্ন খরচের কারণে মাছের দাম বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এ সময় তাদের কাছ থেকে ইলিশ কেনেন। তবে তার এসব বক্তব্যের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকার বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদীন জানান, বাবুবাজারে ফজরের নামাজের পর থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত মৎস্য আড়তে মা ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির নদীর মাছ বিক্রি হয়। এ সময় প্রশাসনিক তৎপরতা তেমন চোখে পড়ে না বলে দাবি তার।
অন্যদিকে, আমিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা রুমান, সোহাগ ও আলাউদ্দিনের অভিযোগ, দুপুর ১২টার পর থেকেই আমিরাবাদ বাজারের নদীর পাড়ে প্রকাশ্যে মা ইলিশ বিক্রি হতে দেখা যায়। কয়েকশ পাইকার সেখান থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান। তাদের দাবি, প্রতিদিন এ বাজারে কয়েক লাখ টাকার মাছ কেনাবেচা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ষাটনল ও আমিরাবাদের পাশাপাশি এখলাসপুর, মোহনপুর, দশআনী, মুক্তির পল্লী ও জনতার বাজার এলাকাতেও নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মা ইলিশ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এত বড় এলাকায় মাছ শিকার ও বেচাকেনার অভিযোগ থাকলেও তা বন্ধে নজরদারি কতটা কার্যকর—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
মতলব উত্তর উপজেলার জেলে জসিম উদ্দিন, খোরশেদ বেপারী, আয়নাল মিয়া ও নুরুল হকসহ কয়েকজনের অভিযোগ, মৎস্য অফিস ও মোহনপুর নৌ-পুলিশকে ম্যানেজ করে প্রতিটি নৌকার জন্য ২০ হাজার টাকা দিয়ে তারা ‘টোকেন’ নিয়েছেন। তাদের দাবি, টোকেন ছাড়া নদীতে মাছ ধরতে গেলে জেল-জরিমানার মুখে পড়তে হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
আমিরাবাদ মৎস্য আড়ত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, মাছ ধরা বন্ধ থাকলে জেলেদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক জেলে অভাব-অনটনে দিন কাটান। জাল দিয়ে মাছ ধরেই তাদের জীবিকা চলে। এ কারণে সবকিছু ম্যানেজ করেই বাজার চালানো হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জেলেদের জীবিকার সংকটের বিষয়টি সামনে এলেও নিষেধাজ্ঞার সময়ে মা ইলিশ শিকার ও বিক্রি বন্ধ রাখার আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাই একদিকে প্রকৃত জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের বিষয়টি সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।
রাতে মেঘনা নদীতে জেলেদের চলাচল ও অভিযান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে নৌ-পুলিশের চাঁদপুর সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আজমির হোসেন, হরিনা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আব্দুল কাইয়ুম এবং মোহনপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রুহুল আমিন জনবল সংকটের কথা জানান। তাদের ভাষ্য, পর্যাপ্ত ফোর্স না থাকায় রাতে অভিযান পরিচালনা করতে কিছুটা সমস্যা হয়। তারপরও নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তারা।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সজিব চন্দ্র দে বলেন, কার্যালয়ে জনবল কম থাকলেও নিয়মিত নদীতে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অভিযানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণও জানান তিনি।
তবে জনবল সংকটের কারণে রাতের নদীতে নজরদারি দুর্বল হয়ে পড়লে নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগ কতটা কার্যকরভাবে ঠেকানো যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে কথিত টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং মাছ শিকার ও বিক্রির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ শিকার চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও নদীর মৎস্যসম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই ষাটনল থেকে চরভৈরবী পর্যন্ত নদী এলাকায় রাতের নজরদারি জোরদার, বিভিন্ন ঘাট ও বাজারে মাছ বিক্রি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, কথিত টোকেন বাণিজ্যের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এখন দেখার বিষয়, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেয় এবং নিষেধাজ্ঞার বাকি সময়ে মেঘনায় মা ইলিশ রক্ষায় কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।