মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে বৈঠকে বসেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার, উত্তেজনা প্রশমন এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন করে বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজাই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দাপ্রধান ইব্রাহিম কালিন অংশ নিচ্ছেন। ইরানের পক্ষ থেকে দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের প্রধান মোহসেন রেজাইসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের আলোচনার কথা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি ও রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় ইসরায়েলের আঞ্চলিক নীতি, ফিলিস্তিন ও লেবাননের পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের প্রভাব গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরি এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোর বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, বৈঠকের আলোচ্যসূচি চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত না হলেও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সবচেয়ে জরুরি হুমকিগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। সৌদি আরবের পক্ষ থেকেও উত্তেজনা কমানো, আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উপায় খোঁজার কথা বলা হয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতও নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে। সৌদি আরবের ওপর হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অংশীদার। চুক্তিটির আওতায় কোনো সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার কথা রয়েছে। এমন এক সময়ে এই তিন দেশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইরান সফরকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের গত সপ্তাহের তেহরান সফরের সময় এই বৈঠকের প্রস্তাব ওঠে। এর আগে কাতারের মধ্যস্থতাকারীরাও উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এর আগে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল, তবে পরে সংঘাত আবার শুরু হওয়ায় সেই উদ্যোগ ভেঙে পড়ে।
বৈঠকটি থেকে তাৎক্ষণিক কোনো চুক্তি বা বড় সিদ্ধান্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর একসঙ্গে আলোচনায় বসা আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর উদ্যোগে নতুন গতি আনতে পারে। বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা এবং ইয়েমেনের সংঘাত নিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ তৈরি হয় কি না, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।
সূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), আনাদোলু এজেন্সি।