ইউরোপজুড়ে জেন–জির বিদ্রোহের আগুন, উত্তাল রাজপথ—চাপে সরকারগুলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

শিক্ষার দুরবস্থা, আবাসনসংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস,

2026-10-25T17:45:04+00:00
2026-10-25T17:45:04+00:00
  সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬,
১০ কার্তিক ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইউরোপজুড়ে জেন–জির বিদ্রোহের আগুন, উত্তাল রাজপথ—চাপে সরকারগুলো
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রোববার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৫:৪৫ পিএম 
বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের শেল সরিয়ে দিচ্ছেন এক বিক্ষোভকারী। ফ্রান্সের প্যারিসে, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ছবি: এএফপি
শিক্ষার দুরবস্থা, আবাসনসংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ইউরোপজুড়ে রাজপথে নেমেছেন তরুণেরা। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস, বেলজিয়াম, আলবেনিয়া ও সার্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ঘিরে বাড়ছে উত্তেজনা। আন্দোলনের সামনের সারিতে রয়েছেন জেনারেশন জেড বা জেন–জির তরুণেরা। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, শ্রমিক ও বিভিন্ন বয়সের সাধারণ মানুষ।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) ইউরোপের বিভিন্ন শহরে নতুন করে বিক্ষোভ হয়েছে। কোথাও শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কয়েকটি দেশে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। বিক্ষোভের বিস্তার ও তীব্রতা ইউরোপের বিভিন্ন সরকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।

কেন ক্ষোভে ফুঁসছেন তরুণেরা?

দেশভেদে আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও সংকটের জায়গাগুলো প্রায় একই। মানসম্মত শিক্ষার অভাব, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার বাড়তি খরচ, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।

অনেক তরুণের আশঙ্কা, তাঁদের মা–বাবার প্রজন্ম যে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছে, তাঁরা সেই সুযোগ পাবেন না। পড়াশোনা শেষ করেও ভালো চাকরি, সাশ্রয়ী বাসস্থান ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত হতাশা এখন সম্মিলিত প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে।

ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষা ও আবাসনসংকটের পাশাপাশি দুর্বল সরকারি সেবা, জ্বালানির বাড়তি দাম, দুর্নীতি এবং সামাজিক বৈষম্যও বিক্ষোভের অন্যতম কারণ।

ফ্রান্সে বিক্ষোভ, নিরাপত্তা জোরদার

ফ্রান্সে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে এতে যুক্ত হন শ্রমিক, কৃষক, জলবায়ুকর্মী ও অন্যান্য সংগঠনের সদস্যরা।

গত সপ্তাহের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, লুটপাট ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করে। শনিবার প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে আবারও বিক্ষোভ হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে।

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষকদের সংকট নিরসন, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং তরুণদের ওপর পুলিশের সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।

স্পেনে আবাসনসংকট ঘিরে ক্ষোভ

স্পেনে আবাসনসংকট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি তরুণদের আন্দোলনের বড় কারণ হয়ে উঠেছে। ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন অ্যাবাসকালকে তাঁর বাড়ি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা দেশটিতে আবাসন নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়।

বিক্ষোভকারীরা সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা, বাড়িভাড়ার লাগাম টানা এবং ভাড়াটেদের উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। আবাসন নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি পেনশন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়েও বিক্ষোভ হয়েছে। স্পেনে ১১ নভেম্বর নতুন কর্মসূচির ঘোষণাও এসেছে।

ইতালি ও পর্তুগালেও বাড়ছে উত্তাপ

ইতালির রোম, তুরিন ও বোলোনিয়াসহ বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা খাতে কম বরাদ্দ এবং যুদ্ধবিরোধী দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শনিবার দেশটির বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কিছু স্থানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেলেও সব সমাবেশ সহিংস ছিল না।

পর্তুগালে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আবাসনসংকট। রাজধানী লিসবনসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়িভাড়া কমানো, সাশ্রয়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং ভাড়াটেদের উচ্ছেদ সহজ করে দেওয়া আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। দেশটিতে আবাসন নিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মজুরি, পেনশন ও সরকারি সেবার প্রশ্নও।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, সার্বিয়ায় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জোরালো হয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী এদি রামের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ। অন্যদিকে সার্বিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলছে।

এসব দেশে আন্দোলন শুধু শিক্ষা বা জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; কোথাও কোথাও তা সরকার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতেও রূপ নিয়েছে।

এক দেশের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ছে অন্য দেশে

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের তরুণেরা পরস্পরের আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নিচ্ছেন। ফ্রান্সের বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইতালি ও গ্রিসের শিক্ষার্থীরা স্লোগান দিয়েছেন। স্পেনের আবাসন আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে পর্তুগালেও।

ফ্রান্স ও স্পেনের শ্রমিক সংগঠনগুলো যথাক্রমে ৫ ও ১১ নভেম্বর নতুন কর্মসূচি বা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। জার্মানিতে ৩১ অক্টোবর দেশব্যাপী বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ইতালি ও যুক্তরাজ্যের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো ২০ নভেম্বর শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা করছে।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাই বড় সংকট

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের চলমান বিক্ষোভকে শুধু তরুণদের ক্ষোভ হিসেবে দেখলে সংকটের গভীরতা বোঝা যাবে না। শিক্ষা, আবাসন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষের অসন্তোষ এক জায়গায় এসে মিলেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে চাকরির বাজারে অনিশ্চয়তা, জলবায়ু সংকট এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপের কয়েকটি দেশের উচ্চ সরকারি ঋণ ও অর্থনৈতিক চাপ সরকারি ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত করছে।

ফলে আন্দোলনকারীদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—সরকারগুলো কি তাঁদের দাবির কার্যকর সমাধান দিতে পারবে, নাকি ইউরোপের রাজপথে বিক্ষোভ আরও দীর্ঘ ও তীব্র হবে?

সূত্র: সিএনএন, রয়টার্স, এপি ও ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম।


Loading...
Loading...

আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: