ইসরায়েলের রাজনীতিতে এক বড় সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সামনে এখন কঠিন রাজনৈতিক পরীক্ষা। একদিকে আবারও ক্ষমতায় ফেরার লড়াই, অন্যদিকে দুর্নীতির মামলার বিচার ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঘিরে চাপ। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে—নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে? ক্ষমতায় টিকে থাকবেন, নাকি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ছিটকে পড়বেন?
আগামী মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচন। এই ভোটে নির্ধারিত হবে দেশটির পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ। তবে নির্বাচনে জয় পেলেই যে নেতানিয়াহুর সব সংকট কেটে যাবে, এমন নয়। আবার পরাজয় মানেই তাঁর কারাগারে যাওয়া—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কারণ, রাজনৈতিক ক্ষমতার হিসাব আর আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা।
ক্ষমতার লড়াইয়ে হাড্ডাহাড্ডি পরিস্থিতি
ইসরায়েলের ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন। দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় সরকার গঠনে জোটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলোতে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য কঠিন পরিস্থিতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিরোধী শিবিরও এগিয়ে থাকলেও তাদের সামনে রয়েছে জোট গঠনের চ্যালেঞ্জ। ফলে নির্বাচনে কোনো পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারলে ছোট দলগুলোর সমর্থন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলও যে শেষ পর্যন্ত সরকার গঠন করবে, তার নিশ্চয়তা নেই। বিভিন্ন দলের মধ্যে সমঝোতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং জোটের হিসাবই ঠিক করবে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন।
নেতানিয়াহুর সামনে কেন এত বড় পরীক্ষা?
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এবারের নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা, পরবর্তী যুদ্ধ, নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন এবং সরকারের নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ ইসরায়েলের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে।
এ ছাড়া সামরিক বাহিনীতে অতি-অর্থোডক্স ইহুদিদের নিয়োগসংক্রান্ত ছাড় এবং যুদ্ধ পরিচালনা নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। বিরোধীরা এসব ইস্যুতে সরকারের জবাবদিহি দাবি করছে। ফলে এবারের ভোট শুধু সরকার পরিবর্তনের নির্বাচন নয়, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের পরীক্ষাও।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ২৫ অক্টোবরের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর সাবেক কিছু সমর্থকের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের একটি অংশ বিরোধী শিবিরের দিকে ঝুঁকছেন। তবে নেতানিয়াহুর প্রতি দীর্ঘদিনের সমর্থনও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
দুর্নীতির মামলা ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি নেতানিয়াহুকে আইনি চাপও মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তাঁর বিরুদ্ধে ইসরায়েলে দুর্নীতিসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন। এসব মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। তাই তাঁকে দোষী সাব্যস্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। আদালতের এখতিয়ার ও পরোয়ানার বাস্তবায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এই পরোয়ানা ইসরায়েলি নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট পরাজিত হলেও তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যাবে না। একইভাবে ক্ষমতায় ফিরলেও বিচারপ্রক্রিয়া থেকে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি পাবেন না।
ঝুলন্ত পার্লামেন্টের আশঙ্কা
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটাররা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচন করেন না; তাঁরা ভোট দেন রাজনৈতিক দলকে। জাতীয়ভাবে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে পার্লামেন্টে আসন বণ্টন করা হয়। কোনো দলকে নেসেটে আসন পেতে অন্তত ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোট অর্জন করতে হয়।
ভোটের পর প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন দলের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেন এমন একজন পার্লামেন্ট সদস্যকে, যিনি প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন বলে মনে হয়। এরপর শুরু হয় জোট গঠনের আলোচনা।
এবারও যদি কোনো পক্ষ ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দীর্ঘ রাজনৈতিক দর-কষাকষি শুরু হতে পারে। জোট গঠনে ব্যর্থতা দেশটিকে নতুন নির্বাচনের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
নেতানিয়াহু আবার প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচনে তাঁর জোটের আসনসংখ্যা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর। আর তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলার পরিণতি নির্ধারিত হবে আদালতের প্রক্রিয়ায়।
তাই আপাতত প্রশ্নটি শুধু ক্ষমতায় ফেরা কিংবা কারাগারে যাওয়ার নয়; বরং নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিজের দীর্ঘ আধিপত্য ধরে রাখতে পারবেন কি না, সেটিই বড় বিষয়। ২৭ অক্টোবরের নির্বাচন সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারে।