ফুটবল মাঠে খেলোয়াড়দের সতর্ক করতে হলুদ কার্ড কিংবা মাঠ থেকে বের করে দিতে লাল কার্ড দেখানো রেফারিদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি। তবে সেই পরিচিত দৃশ্যেই এবার যুক্ত হচ্ছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। কাগজের কার্ডের বদলে মুঠোফোনের মতো দেখতে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের মাধ্যমে কার্ড দেখানোর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিয়েছে উরুগুয়ের ফুটবল অঙ্গন।
গত বৃহস্পতিবার উরুগুয়ে কাপের ন্যাসিওনাল ও রেনতিস্তাসের ম্যাচে প্রথমবারের মতো এই ডিজিটাল কার্ড ব্যবহারের দৃশ্য দেখা যায়। ম্যাচের রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলা প্রচলিত হলুদ কার্ডের পরিবর্তে একটি ইলেকট্রনিক স্ক্রিন তুলে ধরেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ার পর ফুটবলে প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
প্রশাসনিক কাজ সহজ করাই মূল লক্ষ্য
ডিজিটাল কার্ড চালুর পেছনে রয়েছে রেফারিদের প্রশাসনিক কাজ সহজ করার পরিকল্পনা। বর্তমানে কোনো খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখানোর পর রেফারিকে সাধারণত খাতায় সেই সিদ্ধান্ত লিখে রাখতে হয়। পরে এসব তথ্য ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়।
নতুন ডিভাইসটি মাঠের বিভিন্ন শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত নির্দিষ্ট সময়সহ রেকর্ড করতে পারে। ফলে ম্যাচের ঘটনা নথিভুক্ত করা এবং উরুগুয়ে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ‘কমেট’ প্ল্যাটফর্মে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ হবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
প্রকল্পটির পেছনে রয়েছে ‘রেফে’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর পরিচালক মাউরো সাকো বলেন, ফুটবলের যে অংশটি এখনো প্রচলিত অ্যানালগ পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে, সেখানে প্রযুক্তি যুক্ত করাই তাঁদের লক্ষ্য।
কার্ড দেখানোর সেই নাটকীয়তা কি থাকবে?
নতুন প্রযুক্তিতে প্রশাসনিক সুবিধা মিললেও ফুটবলের চিরচেনা আবহ কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, রেফারির পকেট থেকে দ্রুত হলুদ বা লাল কার্ড বের করে দেখানোর দৃশ্য খেলাটির পরিচিত অংশ।
রেফারি এদুয়ার্দো ভারেলার মতে, ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করা স্বাচ্ছন্দ্যকর এবং এর সফটওয়্যারও দ্রুত কাজ করে। তবে প্রচলিত কার্ড দেখানোর তাৎক্ষণিক নাটকীয়তা নতুন পদ্ধতিতে কিছুটা কমে যায়। তারপরও প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সূর্যের আলোয় স্ক্রিন দেখা নিয়ে সমস্যা
পরীক্ষামূলক ব্যবহারে নতুন ডিভাইসটির কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে। এর আগে সূর্যের আলোয় স্ক্রিন স্পষ্টভাবে দেখা না যাওয়ায় একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ বাতিল করতে হয়েছিল। সাম্প্রতিক ম্যাচেও মাঠের দর্শক ও টেলিভিশনে খেলা দেখা দর্শকদের কেউ কেউ ডিভাইসের সংকেত বুঝতে সমস্যায় পড়েন।
প্রকল্পটির সহপরিচালক দিয়েগো দে লা পেনা জানিয়েছেন, প্রযুক্তিটি আরও উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে হলুদ ও লাল রং যেন মাঠের দর্শক থেকে শুরু করে টেলিভিশনের দর্শক—সবার কাছেই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়, সেদিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ জন্য ডিভাইসটির চারপাশে এলইডি আলো যুক্ত করাসহ বিভিন্ন পরিবর্তন নিয়ে কাজ করছেন নির্মাতারা।
ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার আশা
নতুন প্রযুক্তিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ এটিকে ফুটবলের আধুনিকায়নের নতুন পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ প্রচলিত কার্ডের বিকল্প হিসেবে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
তবে সমালোচনা ও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া—দুই ধরনের আলোচনাকেই উদ্ভাবনের অংশ হিসেবে দেখছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের আশা, ডিভাইসটির কার্যকারিতা ও দৃশ্যমানতা আরও উন্নত করা গেলে ভবিষ্যতে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনমেবল এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার স্বীকৃতি পাওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।
তবে এখনই প্রচলিত হলুদ ও লাল কার্ড উঠে যাচ্ছে, এমন নয়। আপাতত এটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ। প্রযুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাবে কি না, তা নির্ভর করবে এর কার্যকারিতা, ব্যবহারযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট ফুটবল কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।