কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ও পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু রয়েছে। আগুন থেকে বাঁচতে রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন পরিবারের সদস্য মো. আশিকুল ইসলাম। তবে তাঁর স্ত্রীসহ পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক জানিয়েছেন, গত জুনে পরিদর্শনের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। এরপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চলছিল।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো স্থাপনায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তল্লাশি চালিয়ে একে একে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
টয়লেট থেকে উদ্ধার চার মরদেহ
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তল্লাশি চালিয়ে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়। মরদেহগুলো আগুনে মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চারজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উদ্ধার অভিযান চলাকালে আরও কেউ নিখোঁজ রয়েছেন কি না, তা নিয়েও খোঁজ নেওয়া হয়।
রিসোর্টে আগুনে মারা গেছেন নাফিস তেহামী (বায়ে), লায়লা জাহান নাবিলা (ডানে) ও ইসরাত জাহান মালিহা (মাঝে)
নিহত ছয়জন একই পরিবারের
হাসপাতাল সূত্রে পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ছয়জন হলেন ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে কক্সবাজার গিয়েছিলেন মো. আশিকুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। শনিবার সকালে তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল।
আগুন লাগার পর আশিকুল ইসলাম রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তবে তাঁর স্ত্রী, শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনের মৃত্যু হয়। পরিবারের স্বজনেরা কক্সবাজারে গিয়ে মরদেহ শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন।
দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত
এ ঘটনায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলার মৃত্যুর খবর জানিয়েছে গণমাধ্যম। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন শোক প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিস তেহামীর মৃত্যুর খবরও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। তবে নিহতদের পরিচয়সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নামের তালিকায় অমিল রয়েছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরিচয় পুনরায় নিশ্চিত করা জরুরি।
ছাড়পত্র ছিল না, আগেই দেওয়া হয়েছিল সতর্কবার্তা
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার জানান, টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। চলতি বছরের জুনে ফায়ার সার্ভিসের পরিদর্শক দল রিসোর্টটি পরিদর্শন করে অগ্নিঝুঁকি শনাক্ত করে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনতলা রিসোর্টটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। কাঠ ও বাঁশের তৈরি স্থাপনাটিতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমনব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আগুনের সূত্রপাত নিয়ে তদন্ত
রিসোর্টের রান্নাঘরের গ্যাসের চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে ফায়ার সার্ভিস। তবে অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি আগুনের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে।
ছয়জন দগ্ধ হাসপাতালে
অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ ছয়জন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাঁরা হলেন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল তাঁদের চিকিৎসার তথ্য জানিয়েছেন। আহতদের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল থেকে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজারের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় এমন প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং আগেই দেওয়া সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।