দেশে সারসংকট ও সার ডিলার নিয়োগে চরম দলীয়করণ, দুর্নীতি, অনিয়ম ও নৈরাজ্য চলছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেছেন, এসব অনিয়মের প্রভাব পড়ছে কৃষি ও সাধারণ মানুষের ওপর। বিদ্যমান সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সারসংকট এবং সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির প্রতিবাদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, দেশে সংকটের অভাব নেই। যেখানে হাত দেবেন, সেখানেই সংকট রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সার বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে যোগ্য ব্যক্তিদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কৃষিমন্ত্রীর হলেও এ বিষয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার কারণে জেলায় গঠিত কমিটিতে রাজনৈতিক বিবেচনায় তিনজনকে মনোনীত করা হয়েছে। বিএনপির নেতারা টাকার বিনিময়ে ডিলার নিয়োগ দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ারের অভিযোগ, সরকারের অব্যবস্থাপনা, ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি, কালোবাজারে সার বিক্রি এবং চোরাচালানের কারণে দেশে সারসংকট তৈরি হয়েছে। ডিলার নিয়োগে নির্ধারিত শর্ত মানা হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিছু এলাকায় দলীয় প্যাডে দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। দিনাজপুর ও রংপুরের বদরগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ডিলারশিপ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তাঁর দাবি, হাইকোর্টের আদেশ উপেক্ষা করেও ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নয়, বরং ‘সবার আগে বিএনপি’ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলো হলো—
১. সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
২. ডিলার নিয়োগে যোগ্যতা মূল্যায়নের মানদণ্ড, তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স প্রদানের ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৩. ডিলারশিপ পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. সারসংকট নিয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্যের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার প্রকৃত পরিস্থিতির অসংগতি যাচাই করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
৫. ডিলার নিয়োগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষকে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং তদন্তের অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।
৬. কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। ভিত্তিহীন অভিযোগ বা রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে কাউকে দায়ী করা যাবে না।
সংবাদ সম্মেলনে সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং অনুমোদিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করতে চায় জামায়াত। কিন্তু সরকার তা উপেক্ষা করে বিরোধী দলকে সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এভাবে বিরোধী দলকে বাইরে রেখে রাজনৈতিক অপকৌশল আড়াল করার চেষ্টা চলছে। ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকার লক্ষ্যকে তিনি ফ্যাসিবাদী চিন্তার সঙ্গে তুলনা করেন। এ ধরনের অবস্থান থেকে ক্ষমতাসীনদের ফেরানোর চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিতর্ক রাজপথে না নিয়ে সংসদে সমাধানের আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল ও অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়েরসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।