ঢাকের বাদ্য, শঙ্খের ধ্বনি আর বর্ণিল আলোকসজ্জায় উৎসবের রঙে সেজে উঠেছে দেশের পূজামণ্ডপগুলো। অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল শুক্রবার মহাষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পূজাকে ঘিরে এবার পাঁচ দিনের ছুটি ও বাড়তি নিরাপত্তায় দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ।
মহাষষ্ঠীর বোধনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আনুষ্ঠানিক জাগরণ হবে। এরপর শনিবার ও রোববার মহাসপ্তমী, সোমবার মহাঅষ্টমী এবং মঙ্গলবার মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার মহাসপ্তমী তিথি দুই দিনজুড়ে থাকায় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে সপ্তমী থেকেই। এদিন দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদ নিয়ে ‘নবপত্রিকা’ স্নান ও পূজার আয়োজন করা হবে।
এরপর সোমবার মহাঅষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হবে দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ ‘সন্ধিপূজা’। অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে এই বিশেষ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। মঙ্গলবার মহানবমীতে পূজার শেষ ধাপের আনুষ্ঠানিকতা ও দেবীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদন করা হবে। বুধবার বিজয়া দশমীতে শোভাযাত্রা করে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হবে নির্ধারিত নদী, পুকুর বা জলাশয়ে। সেখানেই বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনের উৎসব।
ঘোড়ায় আসবেন দেবী, ফিরবেন নৌকায়
পঞ্জিকামতে, এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন হবে ঘোড়ায় চড়ে। আর পূজা শেষে নৌকায় চড়ে স্বর্গলোকে গমন করবেন দেবী। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাসে দেবীর আগমন ও গমনের বাহনের সঙ্গে জগতের মঙ্গল-অমঙ্গলের নানা প্রতীকী ব্যাখ্যা রয়েছে।
এবার ছুটি পাঁচ দিন
দুর্গাপূজা উপলক্ষে এবার বাড়ানো হয়েছে সরকারি ছুটি। হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে তা যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি ভোগ করবেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক উল্লেখ করে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
বেড়েছে পূজামণ্ডপ ও সরকারি অনুদান
দেশজুড়ে এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যাও বেড়েছে। গত বছরের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি মণ্ডপ বেড়ে এবার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টি।
পাশাপাশি পূজামণ্ডপের জন্য সরকারি অনুদানও বাড়ানো হয়েছে। গত বছর ৪ কোটি টাকা থাকলেও এবার তা বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
রাজধানীসহ সারাদেশের মণ্ডপগুলোতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। কোথাও প্রতিমা স্থাপন, কোথাও প্যান্ডেল নির্মাণ ও সাজসজ্জা, আবার কোথাও চলছে আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। অনেক মণ্ডপে ইতোমধ্যে পূর্ণতা পেয়েছে বর্ণিল সাজ।
নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিটি পূজামণ্ডপে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি মণ্ডপভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবক দলও নিরাপত্তার কাজে যুক্ত থাকবে।
বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো কারণে বিদ্যুৎ বা জেনারেটর বিকল হলে যাতে পূজামণ্ডপ অন্ধকারে না থাকে, সে জন্য বিকল্প হিসেবে রিচার্জেবল লাইট বা বাতি প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে খোলা হবে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ।
ঢাকেশ্বরীতে বিশেষ আয়োজন
রাজধানীর কেন্দ্রীয় পূজা উৎসব হিসেবে পরিচিত ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে এবারও থাকছে নানা আয়োজন। পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা ও বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে।
রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, তাঁতীবাজার, শাঁখারীবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও মণ্ডপেও চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
এর আগে গত ১০ অক্টোবর নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহালয়া উদযাপন করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই মূল উৎসবের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপগুলো।
দুর্গাপূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে এর ব্যাপ্তি আরও বড়। পূজাকে ঘিরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ, আনন্দ ও সম্প্রীতির আবহ তৈরি হয়। তাই ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শারদীয় দুর্গোৎসব বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এবারও সেই উৎসবের আবহে দেশজুড়ে এখন অপেক্ষা শুধু মহাষষ্ঠীর বোধনের। ঢাকের শব্দে, শঙ্খের ধ্বনিতে আর আলোর সাজে শুরু হতে যাচ্ছে শারদীয় উৎসব।