বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এপ্রিল—জুন প্রান্তিক শেষে দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণ এ পর্যায়ে দাঁড়ায়। আগের প্রান্তিকের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এদিকে, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়ায় দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জুন শেষে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ বেড়ে ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ খাতে ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ডলার কমে ১৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার পর সরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে।
এক বছরে ঋণ পরিশোধ রেকর্ড ৪ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলার
এদিকে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি বাড়ছে ঋণ পরিশোধের ব্যয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫—২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ৪ দশমিক ৪৯৪ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরে এটিই সর্বোচ্চ ঋণ পরিশোধ। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার।
গত অর্থবছরে পরিশোধিত অর্থের মধ্যে ঋণের আসল ছিল প্রায় ২ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ছিল ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
চলতি ২০২৬—২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও ঋণ পরিশোধের চাপ অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই—আগস্ট সময়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ বাবদ ৬৯৮ দশমিক ৯২ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে। একই সময়ে নতুন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান হিসেবে এসেছে ২৯৪ দশমিক ৫৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এ দুই মাসে নতুন ঋণ ও অনুদানের প্রাপ্তির তুলনায় ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বেশি ছিল।
ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫—২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে নতুন বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫ দশমিক ২৪৩ বিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, নতুন প্রতিশ্রুতি কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। একই সময়ে বৈদেশিক সহায়তার অর্থ ছাড় ৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮ দশমিক ০৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের অর্থ কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প ও উৎপাদনশীল খাতে কার্যকর বিনিয়োগ হলে ঋণ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় না এলে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন ঋণ গ্রহণের আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক উপযোগিতা যাচাই, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয় বাড়ানোর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান শক্তিশালী করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রধান চ্যালেঞ্জ শুধু ঋণের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ নয়; বরং ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখা।