ট্যাক্সের আওতায় আসছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী জাহাজ

সুমন হাওলাদার

বাণিজ্য

গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষেপ কার্বণ নিঃসরণে টনপ্রতি দিতে হবে ১০০-৩৫০ ডলার ফিজীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর নিঃসরণের সর্বোচ্চ সীমার জন্য টনপ্রতি ৩৮০ ডলার

2026-10-11T11:35:56+00:00
2026-10-11T11:35:56+00:00
  সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬,
২৭ আশ্বিন ১৪৩৩
 
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
বাণিজ্য
আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির শঙ্কা
ট্যাক্সের আওতায় আসছে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী জাহাজ
সুমন হাওলাদার
রোববার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৫ এএম 
সংগৃহীত ছবি
গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষেপ

কার্বণ নিঃসরণে টনপ্রতি দিতে হবে ১০০-৩৫০ ডলার ফি

জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর নিঃসরণের সর্বোচ্চ সীমার জন্য টনপ্রতি ৩৮০ ডলার এবং একটি নির্দিষ্ট সীমার বেশি নিঃসরণের জন্য টনপ্রতি ১০০ ডলার ফি আরোপ করা হবে। এর ফলে জাহাজ মালিকদের হয় কম কার্বনযুক্ত জ্বালানিতে স্থানান্তরিত হতে হবে, নতুবা অতিরিক্ত নিঃসরণের জন্য এই ফি প্রদান করতে হবে। এই নীতি ২০২৫ সালের অক্টোবরে আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। যা ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বাড়বে বাণিজ্য ব্যয়। আমদানি নির্ভর শিল্পের খরচ বাড়বে।

জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (আইএমও) আয়োজিত মেরিন এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন কমিটির (এমইপিসি) ৮৩তম অধিবেশনে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কন্টেইনারবাহী জাহাজ ‘আইএমও নেট-জিরো বাই ২০৫০ ফ্রেমওয়ার্ক’ শীর্ষক নতুন এই নীতি কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নীতিতে বরা হয়েছে, পাঁচ হাজার টনের চেয়ে বড় জাহাজগুলোর জন্যে এই ট্যাক্স বাধ্যতামূলক হবে, যা আন্তর্জাতিক শিপিং খাতের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৮৫ শতাংশের জন্য দায়ী। ধারণা করা হচ্ছে, এই কার্বন ট্যাক্স ব্যবস্থা থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আয় হতে পারে। তবে, জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এই চুক্তিকে ‘অপূর্ণাঙ্গ’ বলে সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, এটি ২০৩০ সাল নাগাদ শিপিং খাতে মাত্র ১০ শতাংশ নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা আইএমওর ২০২৩ সালের সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় কম।

লন্ডনভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ‘ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই ফ্রেমওয়ার্ক ২০৪০ সাল নাগাদ ৬০ শতাংশ নিঃসরণ কমাতে সক্ষম হলেও ২০৫০ সালের নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, ভারত, ব্রাজিল ও চীনসহ ৬৩টি দেশ এই নীতিকে সমর্থন করলেও সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলার মতো প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো এর বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে এবং তাদের জাহাজের ওপর আরোপিত ফি’র বিরুদ্ধে ‘পারস্পরিক ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, দায়ী শিপিং খাত বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের ৩ শতাংশ করে থাকে। একে নিয়ন্ত্রণে আনতে কার্বন ট্যাক্স একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব এবং দরিদ্র দেশগুলোর ওপর যাতে বাড়তি বোঝা তৈরি না হয়, তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমওর এই সিদ্ধান্ত শিপিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে এই খাতটি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হলো, এই প্রস্তাবিত রাজস্ব কীভাবে পুনর্বণ্টন করা হবে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্পে ন্যায্য পরিবর্তনে কীভাবে সহায়তা করা হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সারা বিশ্বে বেসরকারি খাত কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। উন্নত দেশ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক বাস ও গাড়ি উৎপাদনে বিনিয়োগ করার বিষয়টিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ফেডারেশন চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআিই) একাধিক সদস্য জানান, আমাদের যতটা সম্ভব কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। কর আরোপই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ। কর আরোপে শুধু জ্বালানির দামই বাড়বে না, বরং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করবে। সরকার যদি পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি আমদানি করতে চায় তবে দূষণকারীদের উপর কর আরোপ করতে হবে।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)-এর চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘গ্রিন ট্যাক্স প্যাকেজের আওতায় এই কার্বন ট্যাক্স আরোপের সিদ্ধান্তকে আমরা ইতিবাচকভাবেই দেখি। তবে দেখতে হবে এই ট্যাক্স কোন খাতে খরচ হয়। এটা যদি সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর কোনো কৌশল হয়, তাহলে খুব বেশি কাজে আসবে না। এটা পরিবেশ রক্ষার কাজে ব্যয় করতে হবে। এই ট্যাক্স হতে হবে উচ্চহারে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে উৎসাহ দিতে হবে।’

তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পরিবেশ ও অর্থনৈতিক নীতিমালায় কার্বন নির্গমন এবং পরিবেশগত করের বিষয়ে সার্বিক কিছু রূপরেখা ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গ্রিন বাজেট ও কার্বন মার্কেট বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক উত্থাপিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘ অধিভুক্ত আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) কর্তৃক বিশ্বজুড়ে জাহাজের ওপর কার্বন শুল্ক (নেট জিরো ফ্রেমওয়ার্ক) আরোপের যে প্রক্রিয়া চলছে। সেটি বাণিজ্য-নির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আমদানিকৃত পণ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ভাড়া ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এ কারণে সরকারের বাণিজ্য ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট বৈশ্বিক পরিবর্তনগুলোর ওপর নজর রাখছে। বর্তমান সরকারের জাহাজের ওপর সরাসরি ট্যাক্স নিয়ে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না থাকলেও, সরকার অভ্যন্তরীণভাবে কার্বন নির্গমন কমাতে ২০২৬ সালের বাজেটে বৈদ্যুতিক যান, ই-বাস, চার্জিং স্টেশন ইত্যাদির ওপর কর মওকুফ করেছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহনের ওপর কার্বন কর বা শুল্কের পরিধি বৃদ্ধি করেছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশে পাঁচ হাজার টন (৫,০০০ ডিডব্লিউটি বা গ্রস টন) বা তার চেয়ে বড় আকারের সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১০১টি। এর বেশিরভাগই বেসরকারি খাতের মালিকানাধীন। এর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় মাত্র ৫টি প্রতিষ্ঠানই ৭৭টি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) বহরেও ৫ হাজার টনের চেয়ে বড় বেশ কয়েকটি বড় আকৃতির বাল্ক ক্যারিয়ার ও ট্যাংকার রয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশ কার্বন ট্যাক্স বা কার্বন মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মধ্যে কানাডা, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, চিলি, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউকে, ইউক্রেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (২৭টি সদস্য দেশ) অন্যতম। এরা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর কর আরোপ করে থাকে, যা কার্বন-ভিত্তিক জ্বালানিকে ব্যয়বহুল করে তোলে।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: