মূল্যবৃদ্ধিতে পূজার আমেজ ম্লান, কেনাবেচায় ভাটা

আজহারুল হক ফরাজী

বাণিজ্য

শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ, রং-তুলির

2026-10-14T12:29:49+00:00
2026-10-14T12:29:49+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬,
৩০ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
বাণিজ্য
মূল্যবৃদ্ধিতে পূজার আমেজ ম্লান, কেনাবেচায় ভাটা
ক্রেতাদের ঝোঁক কম দামের পণ্যে, কাঙ্ক্ষিত বিক্রি না হওয়ায় হতাশ ব্যবসায়ীরা
আজহারুল হক ফরাজী
বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম 
মূল্যবৃদ্ধিতে পূজার আমেজ ম্লান, কেনাবেচায় ভাটা
শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতীবাজার ও লক্ষ্মীবাজারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মন্ডপে মন্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ, রং-তুলির আঁচড়ে দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলা, সাজসজ্জা ও পূজার উপকরণ কেনাকাটায় ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে উৎসবের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এলাকাগুলোতে। শাঁখারীবাজারে শাঁখা, চুড়ি, সিঁদুর, প্রসাধনী ও প্রতিমার সাজসজ্জার সামগ্রী কিনতে ক্রেতাদের আনাগোনা থাকলেও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী জমেনি বেচাকেনা। জ্বালানি তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় পূজার নানা উপকরণের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে মানুষের আয় না বাড়ায় ক্রেতারা ঝুঁকছেন তুলনামূলক সস্তা পণ্যের দিকে। এতে উৎসবের ব্যস্ততার মধ্যেও বিক্রি, বাড়তি খরচ ও কর্মচারীদের বোনাস নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

শাঁখারীবাজারের সাজসজ্জার দোকানগুলোতে গত বছরের তুলনায় প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। প্রতিমার মুকুটের সেট গত বছর ২০০ থেকে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও এবার দাম ৩০০ থেকে ৭ হাজার টাকা। চুলের ক্লিপের দাম ১৯০ টাকা থেকে বেড়ে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা হয়েছে। শাড়ির কাপড়ের দাম প্রতি গজে ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে। ভালো মানের কাপড়ের দাম প্রতি গজ ৮০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০০ টাকায়। গত বছর ২০ টাকার পুঁতির মালা এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়। ভালো মানের সম্পূর্ণ মালার দাম ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা হয়েছে। কেজিপ্রতি পুঁতির মালার দাম ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা। প্রতিমার অস্ত্রের দামও ৮০ থেকে ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে। পণ্যের ধরন ও মানভেদে অবশ্য দামের পার্থক্য রয়েছে।

শাঁখারীবাজারের সাজঘর দোকানের মালিক পিন্টু শাহ ভোরের ডাককে বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা আসছেন না। এতে কর্মচারীদের বোনাস কীভাবে দেবেন, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি। তাঁর ভাষ্য, মানুষের হাতে টাকা-পয়সা কম থাকায় আগের মতো কেনাকাটা হচ্ছে না। আগে ক্রেতারা দামি পণ্য খুঁজতেন, এখন বেশিরভাগই কম দামের সামগ্রী নিতে চান। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিকেও পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। আগে যে পণ্য পরিবহনে ১০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে দিতে হচ্ছে ২৫০ টাকা পর্যন্ত।

একই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী দীপক ধরের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। তাঁর মতে, বিক্রি একেবারে বন্ধ না হলেও আগের তুলনায় কম। অধিকাংশ পণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। আমদানি খরচ ও কর বাড়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পণ্যের দামে। আগে যে পরিবহন খরচ দেড়’শ টাকা ছিল, এখন তা বেড়ে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে ক্রেতারা পছন্দের বা ভালো মানের পণ্য কেনার বদলে কম দামের সামগ্রী বেছে নিচ্ছেন। এ ছাড়া অনেক পূজামন্ডপ কর্তৃপক্ষ চুক্তির ভিত্তিতে নিজেরাই প্রতিমার সাজসজ্জার পুরো কাজ করিয়ে নিচ্ছেন। এতে দোকান থেকে আলাদাভাবে সাজসজ্জার উপকরণ কেনার প্রবণতাও কমছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

পূজার সাজসজ্জার বাড়তি ব্যয়ের প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরিতেও। আকার ও উচ্চতাভেদে গত বছর যে প্রতিমার সেট তৈরিতে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো, এবার তা বেড়ে প্রায় ৯০ হাজার টাকা হয়েছে। প্রতিমাশিল্পী বিপ্লব দাস দুই দশক ধরে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত। এবার শাঁখারীবাজারের শ্রীশ্রী রাধা মাধব জিউদেব বিগ্রহ মন্দিরসহ তিনটি মন্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছেন তিনি। বিপ্লব দাস জানান, প্রতিমার মাটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিমা শুকিয়ে শক্ত হলে শুরু হবে রঙের কাজ। এরপর শাড়ি, পরচুলা ও অলংকার পরিয়ে সাজানো হবে। সব মিলিয়ে কাজ শেষ করতে আরও চার-পাঁচ দিন লাগতে পারে। তাঁর ভাষ্য, দুর্গাপূজার প্রতিমা অন্য পূজার প্রতিমার চেয়ে আলাদা। দেবী দুর্গার পাশাপাশি সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমা এবং ময়ূর, হাঁস, পেঁচা, ইঁদুর ও সিংহের মতো বাহন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ সেট তৈরি করতে হয়। ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ঢাকেশ্বরী মডেলের পাশাপাশি এখন নতুন প্রজন্মের পছন্দের অ্যাকশনধর্মী নকশার প্রতিমাও তৈরি হচ্ছে।

তবে সব পণ্যের বাজারে একই চিত্র নয়। ঢাকের কারিগর সুবল মনিদাশ জানান, গত বছর ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হওয়া ঢাক এবার ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। উৎসবের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনতে শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে ক্রেতাদের আনাগোনাও রয়েছে। শাঁখা, ঐতিহ্যবাহী চুড়ি, সিঁদুর, প্রসাধনী, নতুন পোশাক ও পূজার অন্যান্য উপকরণ কিনছেন অনেকে। তবে সার্বিকভাবে ব্যবসায়ীরা যে বিক্রির প্রত্যাশা করেছিলেন, তা পূরণ হয়নি। তাঁতীবাজার পূজা কমিটির সভাপতি চন্দন দে জানান, এ বছর শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজারে ২২টি মন্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে। আয়োজন নির্বিঘ্ন ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। উৎসবের আবহে কারিগর ও আয়োজকদের ব্যস্ততা বাড়লেও পূজার উপকরণের বাড়তি দাম এবং কেনাবেচার মন্দা পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাজারের ব্যবসায়ীদের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। তাঁদের প্রত্যাশা, উৎসবের দিনগুলোতে ক্রেতা সমাগম আরও বাড়বে এবং শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায় কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াবে ব্যবসা।



Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: