রাজনীতি রাতারাতি বড়লোক হওয়ার জন্য নয়, সার ও ঠিকাদারির কাজ পাওয়ার জন্য দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রামকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের সরকারের পাশে থেকে দেশ পরিচালনায় সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১২ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য প্রয়াত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহের দশম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রিজভী বলেন, কে কী পেলেন আর কে কী পেলেন না, তা নিয়ে ব্যস্ত থাকলে চলবে না। দীর্ঘ ১৭ বছর পর অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। তারেক রহমান দিনরাত পরিশ্রম করে দেশকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখা এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ পরিচালনায় সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ডিজেল আমদানি ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামনে শীতকালীন শাকসবজি, রবিশস্য, ডাল ও চৈতালি ফসল উৎপাদনে ডিজেল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিজভীর ভাষ্য, জ্বালানি সংকটের কারণে রান্নার চুলা জ্বালানো এবং কলকারখানা চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে এবং কিছুদিনের মধ্যে তা স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপির এই নেতা বলেন, সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হবে। নেতাকর্মীদেরও তাঁদের সহযোগিতা করতে হবে। সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ানো জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব।
অতীতের ফ্যাসিবাদী শাসনামলের মতো আচরণ না করার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, ওই সময়ে মানুষের টাকা লুট, জমি দখল এবং গোয়ালঘরের গরু ও পুকুরের মাছ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ছিল। বিএনপি সেই লুটপাটের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করবে না।
তিনি বলেন, সাধারণ ভোটারদের কাছে বিএনপির নেতাকর্মীদের সহনশীল আচরণের দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে হবে। শান্তি, স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বিএনপির অঙ্গীকার। তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও সরকারের অংশ—তাঁদের সহিষ্ণুতার সঙ্গে কাজ করে দেশের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে।
স্মরণসভায় প্রয়াত আ স ম হান্নান শাহের সাহসিকতা, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, হান্নান শাহের জীবন পর্যালোচনা করলে অনেক কিছু শেখার আছে।
রিজভী বলেন, হান্নান শাহ সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে মন্ত্রী এবং বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর বিরুদ্ধে অনৈতিক বা অনিয়মতান্ত্রিক কাজের অভিযোগ কেউ তুলে ধরতে পারবেন না বলে মন্তব্য করেন রিজভী।
হান্নান শাহের ব্যক্তিত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, কারও প্রতি অসন্তুষ্ট হলে তিনি তাৎক্ষণিক ধমক দিতেন, কিন্তু কিছুক্ষণ পরই তা ভুলে গিয়ে সেই ব্যক্তিকে আবার কাছে টেনে নিতেন। এটি ছিল তাঁর স্বভাবের একটি বিশেষ দিক।
হান্নান শাহের পারিবারিক ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে রিজভী বলেন, তাঁর বাবা ফকির আবদুল মান্নান মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঢাকা জেলার একজন খ্যাতিমান আইনজীবীও ছিলেন।
দলের দুঃসময়ে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে হান্নান শাহ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন রিজভী।
হান্নান শাহের সামরিক জীবনের প্রসঙ্গ তুলে রিজভী বলেন, বগুড়া সেনানিবাস প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা ছিল। সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহের বিভিন্ন ঘটনা মোকাবিলা এবং সেনাবাহিনীকে সুশৃঙ্খল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, হান্নান শাহ নিজেই একবার বগুড়া সেনানিবাসে ট্যাংক রেজিমেন্টের সদস্যদের বিদ্রোহের একটি ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, সে সময় হাতে একটি ড্যাগার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন হান্নান শাহ। তাঁর পেছনে অনেক লোক ও ভারী অস্ত্র রয়েছে—এমন ধারণা থেকে বিদ্রোহী সেনাসদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন বলে তিনি জানিয়েছিলেন।
হান্নান শাহের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি ঘটনা তুলে ধরে রিজভী বলেন, চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) চেয়ারম্যানসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
আশির দশকের আন্দোলনের স্মৃতিচারণা করে রিজভী বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদ নির্বাচন বর্জনের আন্দোলন চলাকালে বিএনপির অনেক নেতার সঙ্গে হান্নান শাহও গ্রেপ্তার হন। তাঁকে রাজশাহী কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। কারাগারে থেকেও তিনি আন্দোলনকারীদের কাছে নির্দেশনা পাঠাতেন।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, একবার অন্ধকারে গোপন বৈঠক চলার সময় আন্দোলনকারীদের কাছে একটি চিরকুট পৌঁছায়। তাতে সাংকেতিক ভাষায় ‘স্টপ রাইস, স্টপ চিকেন’ লেখা ছিল। উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকায় চাল ও মুরগি পরিবহন বন্ধ করার চেষ্টা এবং বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরির নির্দেশনা ওই বার্তার মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
রিজভী বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে হান্নান শাহকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে। আশির বেশি বয়সেও তাঁকে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত হান্নান শাহ সাহসের সঙ্গে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন এবং কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে উল্লেখ করেন রিজভী।
হান্নান শাহের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, কারাগারে থাকার সময় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছিল। তা সত্ত্বেও তিনি রাজনৈতিক দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।
স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সংসদ সদস্য ফজলুল হক মিলন। এ সময় বক্তব্য দেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ড. চৌধুরী ইশরাক আহমদ সিদ্দিকী, সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, বিএনপির গাজীপুর জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল, বিএনপি নেতা মো. জেড খান রিয়াজ উদ্দিন নসু, অধ্যাপক ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, হুমায়ুন কবীর খান ও ওমর ফারুক সাফিনসহ অন্যরা।