শীর্ষ পদ ফাঁকা থাকায় সৃষ্টি হচ্ছে প্রশাসনিকসহ নানা জটিলতা
উপাচার্য ছাড়াই চলছে দেশের ৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর উপ-উপাচার্য নেই ৮৮টিতে। বারবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশের পরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগ দিচ্ছে না। দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম মাধ্যম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার বিদ্যমান থাকা অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমানে ৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নেই। অথচ শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটসহ একাডেমিক ও প্রশাসন পরিচালনার অধিকাংশ কাজ তাঁর নেতৃত্বে চলে। এছাড়া ট্রেজারার নেই ৩৯ বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১১৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে কার্যক্রম চালাচ্ছে ১১২টি। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগের বিরুদ্ধেই আইন না মানার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সনদপত্র বিতরণের ক্ষেত্রে উপাচার্যই সনদে স্বাক্ষর করেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য বা অন্য কেউ উপাচার্যের স্বাক্ষর করে সনদ তুলে দিচ্ছেন শিক্ষার্থীদের হাতে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি বলছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের জন্য প্যানেল পাঠিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ওই প্যানেলে তিনজন অধ্যাপকের নাম দিতে হয়। তবে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তিনজন করে উপযুক্ত অধ্যাপক খুঁজে পাওয়া কঠিন।
এ ব্যাপারে ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক মো. ওমর ফারুখ জানান, ভিসি ও ট্রেজারার বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদ। এই দুই পদ শূন্য থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিধিবহির্ভূত অনেক কাজ হয়। এ জন্য অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড ইচ্ছাকৃতভাবে উপাচার্য নিয়োগ দিতে চায় না। উপাচার্য নিয়োগ দেয়া না হলে শিক্ষার মানে প্রশ্ন থাকে। অভিভাবকরাও অনেক সময় না জেনে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করান। সেজন্য নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে আমরা এটি প্রকাশ করি। ট্রেজারার নেই এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে- সেন্ট্রাল উইমেনস ইউনিভার্সিটি, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্সেস, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, নর্থ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়।
আর ভিসি ও ট্রেজারার উভয় পদ বর্তমানে শূন্য এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় রয়েছে- আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, চিটাগং ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, এনপিআই ইউনিভার্সিটি, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিসহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। এদিকে সম্প্রতি এক গণবিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাই করে ভর্তি হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইউজিসি। ইউজিসি গণবিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আইন অমান্য করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ঝামেলায় পড়লে ইউজিসি এর দায় নেবে না। ইউজিসি জানায়, অবৈধ ক্যাম্পাস ও অবৈধভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ইবাইস ইউনিভার্সিটি, আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও দ্য ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার আইনগত কোনো বৈধতা নেই। এছাড়া ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড টেকনোলজিতে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রয়েছে। এ ব্যাপারে শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে ভিসি নিয়োগে এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠন হলে এ বিষয়ে কাজ করা হবে। সার্চ কমিটি চেষ্টা করছে যোগ্য লোকদেরকেই নিয়োগ দিতে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের অনেক সনামধন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চলছে সরকারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় বিরাজ করছে বিশৃঙ্খল পরিবেশ। এছাড়া শিক্ষার নামে সার্টিফিকেট বাণিজ্য, শীর্ষ কর্তাব্যক্তি নিয়োগে উদাসীনতা, নির্দিষ্ট সময়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে না যাওয়া, ট্রাস্টি বোর্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব-মামলা, বছরের পর বছর আর্থিক প্রতিবেদন জমা না দেওয়া, অননুমোদিত কোর্স পরিচালনাসহ নানা অভিযোগ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানা নিয়েও রয়েছে দ্বন্দ্ব। সব মিলে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষা খাতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৭২-এর অধ্যাদেশের আওতায় থাকা চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কোনো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের সুস্পষ্ট কোনো নীতিমালা নেই, এমনকি যোগ্যতার কোনো মাপকাঠিও নেই। কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে সনামধন্য শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। অথচ সম্প্রতি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট নন, এমন শিক্ষকরা নিয়োগ পেয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পরিবর্তন করে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তাদের প্রায় সবাই বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল অথবা ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউট্যাব) সদস্য।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করলেও প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদে বসার জন্য আলাদা দক্ষতা প্রয়োজন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকেন। থাকে শত শত কোটি টাকার বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও বিপুল সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনা। একজন নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে আগে থেকে কাজ করা কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, হিসাব শাখা, রেজিস্ট্রার দপ্তর কিংবা দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর করেন। এই নির্ভরশীলতা স্বাভাবিক হলেও জবাবদিহির কাঠামো দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান ও ঢাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ বলেন, ‘আমরা যদি প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের উপাচার্য হিসেবে পাঠাতে পারতাম তাহলে ভালো ফল পেতাম। উপাচার্য কিন্তু বিশাল দায়িত্ব। আর্থিক প্রশাসনিক ও নিয়োগের মতো জটিল ও কঠিন বিষয়ে যদি কারও ওপর নির্ভর করতে হয় তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’