প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ১৩১ বইয়ে পরিমার্জন, নতুন যোগ হচ্ছে ৪ বিষয়
নব্বইয়ের দশক থেকে দেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের পড়া ও শিক্ষাক্রম বদলে যাওয়ার ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বই পরিমার্জন ও পরিবর্ধনের কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এবার প্রাথমিক স্তরের ৩৬টি ও মাধ্যমিক স্তরের ৯৫টি বই পরিমার্জন করা হয়েছে। একইসাথে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে নতুনভাবে চারটি বই যুক্ত করা হচ্ছে। এতে ইতিহাস বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়, ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গের অবদান ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আবারও নতুনরূপে তুলে ধরা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, বাংলা সাহিত্য এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ (আইসিটি) বিভিন্ন বিষয়ের পাঠেও যুক্ত হচ্ছে নতুন বিষয়বস্তু।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানিয়েছেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তকে যতটুকু সম্ভব পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করা হচ্ছে। ২০২৮ শিক্ষাবর্ষের কারিকুলামে বেশি পরিসরে সংস্কার আনা হবে। তিনি বলেন, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বইয়ের সকল কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে এবং জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শিক্ষার্থীরা এসব বই বিনামূল্যে হাতে পাবে।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের পড়া বদলানোর ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে পাঠ্যবইয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতার বিষয় যুক্ত করে। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার এসে শেখ মুজিবের উল্লেখ কমিয়ে জিয়াউর রহমানকে প্রাধান্য দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ পুনরায় ক্ষমতায় এসে জিয়াউর রহমানের বিষয় কমিয়ে দিয়ে কিংবা অনেকাংশে নাম বাদ দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের বিষয়বস্তু ফিরিয়ে আনে। পরবর্তীকালে ২০২৪ সালের আগস্টে পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে আগের পাঠক্রমে নতুন পরিমার্জন আনে। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের বিষয়বস্তু বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানের আংশিক বিষয় তুলে ধরে ও জুলাইযোদ্ধাদের প্রধান্য দেয়। বর্তমানে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে পাঠ্যবইয়ে আবার এই পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
আগামী শিক্ষাবর্ষে আসছে যেসব পরিবর্তন : এনসিটিবি সূত্রে জানা যায়, নতুন পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে বেশ কিছু বড় ধরনের সংযোজন আনা হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহের ঘোষণা ও স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস যুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া নবম-দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে স্থান পাচ্ছে জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’। পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে যুক্ত হচ্ছে জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জীবনী। একই সঙ্গে অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির বইয়ে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
স্বাধীনতার পরের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকও নতুন পাঠে স্থান পাচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’, মুক্তিযুদ্ধের সাত বীরশ্রেষ্ঠ, বিভিন্ন ব্রিগেড ফোর্স এবং ১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিলের তেলিয়াপাড়া বৈঠকের ঘটনা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ঐতিহাসিক ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপনের অংশ হিসেবে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদের ভূমিকা স্থান পাচ্ছে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘শহিদ আনাসের কথা’ এবং নবম-দশম শ্রেণিতে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ও শহিদ স্মৃতিস্তম্ভের পাঠ থাকছে। বিগত সরকারের শাসনামলের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে ইতিহাস বইয়ে আরও যুক্ত হচ্ছে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, অর্থ পাচার, পিলখানা ট্র্যাজেডি ও সংবাদমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপের বিষয়।
আইসিটি বইয়ে আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), মেশিন লার্নিং ও সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রোগ্রামিং ভাষা পাইথন ও ক্যানভার ব্যবহার যুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ‘খেলাধুলা’ (ক্রীড়া ও সংস্কৃতি), ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ এবং ‘আনন্দময় শিক্ষা’ (বা ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’)।
সরকার বদলালে ইতিহাস বদলে যাওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতার পালাবদলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজেদের মতো করে ইতিহাস সাজাবে, এটা ইতিহাস হতে পারে না। রাজনৈতিক বিবেচনা বা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি নয়, বরং নিরপেক্ষ নথি ও দলিলের ভিত্তিতে ইতিহাস রচনার আহ্বান জানান তিনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, পাঠ্যবই কোনো সরকারের প্রচারণার মাধ্যম হওয়া উচিত নয়।
এনসিটিবি জানিয়েছে, কর্মশালার মাধ্যমে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই পরিমার্জন করা হয়েছে। এসব বইয়ের পান্ডুলিপি ও মুদ্রণের কাজ চলছে। প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য ব্যয় ১,৮০০ থেকে ১,৮৭৯ কোটি টাকা। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় বই পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।