সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ, তবুও অটোর দাপট!

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

“ অভিযান-জব্দেও থামছে না উৎপাদন; যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছেরাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে একের পর এক অভিযান,

2026-10-10T14:01:54+00:00
2026-10-10T14:01:54+00:00
  রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬,
২৬ আশ্বিন ১৪৩৩
 
রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ, তবুও অটোর দাপট!
শাকিল আহমেদ
শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি

“

অভিযান-জব্দেও থামছে না উৎপাদন; যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে

রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণে একের পর এক অভিযান, জব্দ ও ডাম্পিং-কোনোটিতেই যেন থামছে না এসব যানবাহনের দাপট। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রতিদিনই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ঢুকে পড়ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশা। কোথাও বাস-গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে, কোথাও আবার মোড়, ইউটার্ন ও সিগন্যালের কাছে এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে তৈরি করছে যানজট।

শুধু চলাচল নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো চলছে এসব যান তৈরির কারখানা ও গ্যারেজ। গত ১ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের আদাবরে অবৈধ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা তৈরির একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে চারটি অটোরিকশা ও তৈরির সরঞ্জাম জব্দ এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ডিএমপি জানিয়েছে, অবৈধভাবে অটোরিকশা তৈরি ও বিক্রির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এর আগে মূল সড়ক থেকে এসব যান সরাতে নিয়মিত অভিযান চালিয়েছে ট্রাফিক পুলিশ। জব্দ করা বিপুলসংখ্যক রিকশার কারণে শ্যামপুরের পোস্তগোলা সেতুর পাশের ডাম্পিং এলাকাও প্রায় ভরে গেছে। সেখানে দীর্ঘদিন পড়ে থেকে অনেক জব্দ করা রিকশা নষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ একদিকে জব্দ ও ডাম্পিং, অন্যদিকে নতুন করে উৎপাদন-এই দুই প্রক্রিয়া পাশাপাশি চলায় নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযান আছে, কিন্তু উৎপাদন থামছে না : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে শুধু চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না-এমন মত সংশ্লিষ্টদের। কারণ একটি অটোরিকশা সড়কে নামার আগে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কারখানা, গ্যারেজ, চার্জিং পয়েন্ট, যন্ত্রাংশ সরবরাহকারী ও মালিকের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। সম্প্রতি রাজধানীজুড়ে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশার মালিক, চালক, গ্যারেজ, চার্জিং পয়েন্ট ও যান তৈরির কারখানার তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে ডিএমপি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে শুধু সড়কে অভিযান চালালে নতুন যানবাহন নামার প্রবাহ বন্ধ করা কঠিন। এ কারণেই প্রস্তাবিত নীতিমালায় নির্মাতাদেরও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামোয় নিবন্ধন, ফিটনেস পরীক্ষা, চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি মান নির্ধারণের বিষয় রাখা হচ্ছে।

প্রধান সড়কে নিষেধ, বাস্তবে উল্টো চিত্র : সরকারি পর্যায় থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে পুরোপুরি বন্ধ না করে নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। তবে রাজধানীর প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল করতে দেওয়া হবে না। স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নীতিমালায় নিবন্ধিত ই-রিকশা অভ্যন্তরীণ সড়কে চলতে পারবে; প্রধান সড়কে চলাচলের সুযোগ থাকবে না। নিবন্ধনের জন্য কারিগরি সনদ ও ফিটনেস সনদ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও রয়েছে।

অন্যদিকে ৬ অক্টোবর সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল একটি নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা হবে এবং প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, ঘোষণা আর প্রয়োগের মধ্যে এখনো বড় ফাঁক রয়েছে। কুড়িল, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, রায়েরবাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রধান সড়কে এসব যান ওঠার অভিযোগ ও অভিযান নিয়মিতই সামনে আসছে।

দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জনপ্রিয়তার বড় কারণ কম ভাড়া ও সহজলভ্যতা। স্বল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহনে এসব যান অনেক মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াতের অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে হঠাৎ করে পুরো ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়াও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে বড় উদ্বেগ রয়েছে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা জড়িত ছিল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক যানবাহনের কাঠামোগত মান, ব্রেকিং ব্যবস্থা, আলো ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সিপিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেশে প্রায় ৪০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশার কথা বলা হয়েছে; এর প্রায় ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি। গবেষণায় দেশে তৈরি এসব রিকশার চেসিস ও ব্রেকিং ব্যবস্থার মান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও চাপ : শুধু সড়ক নয়, ব্যাটারিচালিত যানবাহনের দ্রুত বিস্তার চাপ তৈরি করছে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনাতেও। সরকারি হিসাবে দেশে বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে হতে পারে। অথচ বৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট থাকার কথা সংসদে জানানো হয়েছে। রাজধানীর রায়েরবাজারে সম্প্রতি যৌথ অভিযানে পাঁচটি ব্যাটারি রিকশার গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। নীতিমালায় সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক চার্জিং ব্যবস্থার কথাও ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি চার্জিং স্টেশনকে অনুমোদিত কাঠামোর মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

কিউআর কোড, ট্র্যাকিং ও নির্দিষ্ট রুট : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে নিবন্ধন ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিবন্ধন, কিউআর কোড ও জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত রুটের বাইরে যাতে এসব যান চলাচল করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে। রাজধানীর ১৭টি সিগন্যালে ইতোমধ্যে ৫০টি এআইভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা চালু রয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নম্বরপ্লেট ও নিবন্ধন না থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে সংসদে আলোচনা হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞা বনাম জীবিকার বাস্তবতা : ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা শুধু একটি যানবাহন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুলসংখ্যক চালক, মালিক, গ্যারেজ শ্রমিক, মেরামতকর্মী, যন্ত্রাংশ ব্যবসায়ী ও চার্জিং ব্যবসা। ফলে নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগে এই জনগোষ্ঠীর জীবিকার বিষয়টিও সামনে আসছে। গত ৫ ও ৬ অক্টোবর রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক ও মালিকদের বিক্ষোভ এবং সড়ক অবরোধের ঘটনা সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। প্রেসক্লাব এলাকায় কয়েক হাজার চালক জড়ো হয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। তাদের দাবির মধ্যে ছিল রোড পারমিট, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, চার্জিং গ্যারেজের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা এবং ডাম্পিং অভিযান বন্ধ করা। ফলে এখন প্রশ্ন-এই বিশাল অনানুষ্ঠানিক পরিবহনব্যবস্থাকে কীভাবে নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোয় আনা হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন যানবাহনের নকশা ও কারিগরি মান নির্ধারণ, অনুমোদিত কারখানা, বাধ্যতামূলক ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নির্ধারিত রুট, বৈধ চার্জিং স্টেশন এবং ডিজিটাল নিবন্ধন। একই সঙ্গে অবৈধ উৎপাদন ও বিক্রির উৎস বন্ধ করতে হবে।

কারণ সড়কে যে অটোরিকশাটি আজ জব্দ হচ্ছে, তার জায়গায় যদি রাতারাতি আরেকটি নতুন অটোরিকশা তৈরি হয়ে যায়, তাহলে অভিযান যতই চলুকরাজধানীর সড়কে দাপট কমবে না। এখন মূল চ্যালেঞ্জ তাই অটোরিকশা বন্ধ করা নয়, বরং অনিয়ন্ত্রিত উৎপাদন ও চলাচল বন্ধ করে একটি কার্যকর, নিরাপদ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের প্রস্তাবিত নীতিমালা বাস্তবায়নেই নির্ধারিত হতে পারে ঢাকার সড়কে ব্যাটারি অটোরিকশা থাকবে বিশৃঙ্খলার প্রতীক হয়ে, নাকি নিয়ন্ত্রিত নগর পরিবহনের অংশ হিসেবে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: