ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজারে অস্থিরতা কাটছে না। কোথাও খুচরা বিক্রেতার দোকানে সিলিন্ডার মিলছে না, কোথাও আবার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েক’শ টাকা বেশি দিয়েও গ্যাস কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পাইপলাইনের গ্যাসের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলো রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সিলিন্ডারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনের সময় তা না পাওয়ার ঘটনা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একবারে কয়েক’শ টাকা বাড়তি খরচ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন ছোট খাবারের দোকান, চায়ের দোকান, হোটেল ও রেস্তোরাঁর ব্যবসায়ীরা। বড় সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত দামের তুলনায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কোনো রেস্তোরাঁয় মাসে ২০টি বড় সিলিন্ডার প্রয়োজন হলে প্রতিটিতে ১ হাজার ২০০ টাকা বাড়তি ব্যয়ের অর্থ মাসে ২৪ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ। এই ব্যয় ব্যবসায়ীদের মুনাফা কমাতে পাওে, আবার খাবারের দাম বাড়ানোর চাপও তৈরি করতে পারে।
“ নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত তিনশ-থেকে চার'শ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয় এলপিজি
গত ৪ অক্টোবর ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে স্বস্তি ফেরেনি। বরং সরবরাহের ঘাটতি ও বাড়তি দামের কারণে ভোগান্তি অব্যাহত রয়েছে। রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় সরেজমিন বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় একটি সিলিন্ডারে গ্রাহককে অতিরিক্ত ৩৬৩ থেকে ৭৬৩ টাকা পর্যন্ত গুনতে হতে পারে। ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার কিনলে অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে ৬৬৩ টাকা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সিলিন্ডারের দামে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। মোহাম্মদপুরের রিং রোড ও কৃষি মার্কেটে ২ হাজার ৪০০ টাকা, আদাবরে ২ হাজার ২০০ টাকা, উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে ২ হাজার ৪০০ টাকা, মিরপুরের ১ নম্বর এলাকায় ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মুগদা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর, লালবাগ, সুত্রাপুর, বাসাবো, গোড়ান, গোপিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অন্তত তিনশ-থেকে চার’শ টাকা বেশি দামে বিক্রি হয়ে এলপিজি, এমন অভিযোগ ক্রেতাদের।
দাম বাড়িয়েছে বিইআরসি, বাজারে বাড়তি আদায় আরও বেশি : বিইআরসির ঘোষণা অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টা থেকে অক্টোবর মাসের জন্য নতুন দাম কার্যকর হয়—১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে ২৫২ টাকা, প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
কিন্তু নির্ধারিত মূল্য বাড়ানোর পরও বাজারে বিক্রয়মূল্য সরকারি দরের সঙ্গে মিলছে না। ২ হাজার ৩০০ টাকায় একটি সিলিন্ডার কিনলে গ্রাহককে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪৬৩ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে। ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৬৬৩ টাকা। বিইআরসি শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডার নয়, বিভিন্ন ওজনের এলপিজির দামও নির্ধারণ করে। কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, আমদানি ও বোতলজাতকরণ থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা—কোনো পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে সরবরাহসংকটের অজুহাতে অতিরিক্ত দাম আদায়ের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সরবরাহ কম, নাকি কৃত্রিম সংকট : রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ক্রেতাদের অভিযোগ, নিয়মিত যে দোকান থেকে সিলিন্ডার কেনেন, সেখানে গিয়ে অনেক সময় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো দোকান বন্ধ থাকছে। আবার কোথাও নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিন্ডার নেই বলে অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার নিতে বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে নতুন সিলিন্ডারের দামসহ অতিরিক্ত অর্থ চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। খুচরা বিক্রেতাদের একাংশের দাবি, পরিবেশকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের বক্তব্য, বেশি দামে কিনতে হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হয়। তবে এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে আমদানিকারক, অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা—প্রতিটি পর্যায়ের ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য এবং সরবরাহের হিসাব মিলিয়ে দেখা জরুরি।
দেশজুড়ে অভিযান, তবু কাটেনি অনিশ্চয়তা : এলপিজির সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) বাজার তদারকির নির্দেশ দেন। কোথাও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলা হয়। বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও সতর্কতা দেওয়া হয়। এরপর ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, খুচরা বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কমিশন নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাজার তদারকি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও জানানো হয়।
চট্টগ্রামে আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে নজরদারি : এলপিজির আমদানি ও সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম। অথচ এই বন্দরনগরীতেও সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যে বাজার নিয়ন্ত্রণে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল দুপুর ১টার দিকে সাংবাদিকদের চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, এলপিজির অবৈধ মজুদ, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমদানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসক জানান, দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের ২১টি মাদার প্ল্যান্টের মধ্যে সাতটি চট্টগ্রামে এবং ১৪টি মোংলায় অবস্থিত। চট্টগ্রামের প্ল্যান্টগুলোতে কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ গ্যাস আমদানি করছে এবং সেই গ্যাস কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আমদানির পর পরিবেশকদের কাছে কতটুকু গ্যাস যাচ্ছে এবং সেখান থেকে খুচরা বাজারে কতটুকু পৌঁছাচ্ছে, তাও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ভাষ্য, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের কাছে নির্ধারিত দামে গ্যাস পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের লক্ষ্য। কোনো পর্যায়ে গ্যাস মজুদ করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।