গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং অবিলম্বে মজুরি বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছে গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (জিবিজিডব্লিউএফ) ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টার (এনডব্লিউইউসি)। সংগঠন দুটির নেতারা বলেছেন, শ্রমিকের দারিদ্র্যের ওপর বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখা যাবে না। পোশাকশিল্পের টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত শ্রমিক সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সংগঠন দুটি যৌথভাবে এ কর্মসূচির আয়োজন করে।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন গ্রীণ বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশন ও ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স ইউনিটি সেন্টারের সভাপতি সুলতানা বেগম। বক্তব্য দেন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নারী কমিটির সভাপতি রোজিনা আক্তার সুমি, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফরিদ উদ্দীন, দপ্তর সম্পাদক ও নারী কমিটির সাধারণ সম্পাদক আমরিন হোসাইন এ্যানি, সহসভাপতি সেলিনা হোসাইন, প্রচার সম্পাদক মো. তাহেরুল ইসলামসহ সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা। সংহতি বক্তব্য দেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসাইন।
সমাবেশে সুলতানা বেগম বলেন, ২০২৩ সালে নির্ধারিত ১২ হাজার ৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি দিয়ে বর্তমান জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো শ্রমিকদের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত, চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প লাখ লাখ শ্রমিকের শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ যেন দীর্ঘসূত্রতা কিংবা নামমাত্র আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থাকে। মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
বক্তারা বলেন, সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে কোনো শিল্প দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং রপ্তানি খাতের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় ন্যায়সংগত মজুরি কাঠামো জরুরি। মজুরি বাড়ালে শিল্প ধ্বংস হবে—এমন প্রচারণাও বাস্তবতাবিবর্জিত বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
তাঁরা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করে। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায়িত্ব শুধু সরকার ও কারখানার মালিকদের নয়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও রয়েছে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি তাঁদের অধিকার।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানের পেছনে শ্রমিকদের দক্ষতা ও কঠোর পরিশ্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অতিরিক্ত উৎপাদনচাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা, অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষা এবং অনিরাপদ কর্মপরিবেশের বোঝা শ্রমিকদের বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাপমাত্রা বৃদ্ধিও শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। হিট স্ট্রেসকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রমিক অধিকারের বিষয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান তাঁরা।
সমাবেশ থেকে আট দফা দাবি
সমাবেশে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য আট দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. অবিলম্বে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড পুনর্গঠন করতে হবে।
২. গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করতে হবে।
৩. মোট মজুরির অন্তত ৬৫ শতাংশ মূল মজুরি হিসেবে নির্ধারণ করতে হবে।
৪. বছরে ন্যূনতম ১৫ শতাংশ মজুরি বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
৫. মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত ও স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
৬. শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের দায়িত্ব নিতে হবে।
৭. হিট স্ট্রেসকে পেশাগত স্বাস্থ্য ও শ্রমিক অধিকারের প্রশ্ন হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
৮. চাকরির নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার ও স্থায়ী ত্রিপক্ষীয় সংলাপ নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল হাইকোর্ট মোড়, তোপখানা রোড ও পল্টন মোড় প্রদক্ষিণ করে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এসে শেষ হয়।