কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু, বদলেছে ধরনও

সাইদুল ইসলাম

জাতীয়

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন মানুষ। একই

2026-10-08T12:51:11+00:00
2026-10-08T12:51:11+00:00
  শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬,
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর ২০২৬
জাতীয়
কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু, বদলেছে ধরনও
মৃত্যু ও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ
সাইদুল ইসলাম
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫১ পিএম 
প্রতীকী ছবি
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন মানুষ। একই সাথে বাড়ছে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাও। গতকাল বুধবারও আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ হাজার ৮৬০ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সেপ্টেম্বরেই মারা গেছে ১৪৮ জন। এছাড়া, অক্টোবরের গত ছয় দিনে ৪২ জন, আগস্টে ৪৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন, জুনে ১৩ জন, মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে বদলে গেছে ডেঙ্গুর ধরনও। ফলে মৃত্যু ও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতিতে দুশ্চিন্তায় রয়েছে সাধারণ মানুষ। 
এদিকে, গতকাল দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৮৬০ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৯২ হাজার ২১৬ জনে।

গতকাল সবচেয়ে বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে ৭৩০ জন, খুলনা বিভাগে ৩৭৬ জন, বরিশালে ২০০, চট্টগ্রামে ২১৬ জন, ময়মনসিংহে ১১০, রংপুরে ৩৮ জন এবং রাজশাহী ১৭৬ জন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মশক নিধন ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের কথা বলা হলেও মৃত্যু ও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।

জানা গেছে, এবার ডেঙ্গুর ধরন পাল্টানোর সাধারণ মানুষ দুশ্চিন্তায় রয়েছে। দেশে এ বছর ডেঙ্গু ভাইরাসের সবচেয়ে বেশি ছড়ানো ধরন (সেরোটাইপ) হয়ে উঠেছে ডিইএনভি-৩। গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এ তথ্য জানিয়েছে। সম্প্রতি আইইডিসিআর ৭১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে। এতে দেখা যায়, ৬৫ জন বা ৯১ দশমিক ৫৫ শতাংশ রোগী ডিইএনভি-৩-এ আক্রান্ত। বাকি ছয়জন বা ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ আক্রান্ত ছিলেন ডিইএনভি-২-এ। অন্যদিকে, গত বছর সবচেয়ে বেশি পাওয়া গিয়েছিল ডিইএনভি-২, হার ছিল ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর ছিল ডিইএনভি-৩ (৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ), ডিইএনভি-১ (৮ দশমিক ৮ শতাংশ) এবং ডিইএনভি-৪ (৬ দশমিক ৩ শতাংশ)। 

জানা গেছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এডিস মশার বিস্তার। বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, পরিত্যক্ত পাত্র, ড্রেন ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন ঘটছে। ফলে একদিকে মশক নিধন অভিযান পরিচালিত হলেও অন্যদিকে নতুন নতুন প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জমে থাকা পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে নগরবাসীর। অনেক এলাকায় নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম না চলা এবং প্রজননস্থল ধ্বংসে পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসায় হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চাপ। চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা জরুরি। কারণ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে জ্বর কমার সময়েও জটিলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু উড়ন্ত মশা নিধন করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এডিস মশার ডিম ও লার্ভার উৎস চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে হবে। একই সাথে বাড়াতে হবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসম্পৃক্ততা। সরকারি সংস্থার পাশাপাশি নাগরিকদেরও নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

নগরবাসীর প্রশ্ন, প্রতিবছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা কর্মসূচি নেওয়া হলেও কেন বারবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? তাদের মতে, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা স্থায়ীভাবে নির্মূল করতে হবে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, অনেক জায়গায় জমে আছে পানি। কোথাও নির্মাণসামগ্রীর পাশে, কোথাও পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের পাত্রে, আবার কোথাও ভবনের ছাদে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে। এসব প্রজননস্থল নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, মশক নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মিত ও পর্যাপ্ত নয়। কোথাও ওষুধ ছিটানো হলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবার অনেক এলাকায় লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি প্রজননস্থল নির্মূলেও কার্যকর নজরদারি নেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বছরজুড়ে মশা নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দিচ্ছেন তারা। ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে সমন্বিত ও ধারাবাহিক উদ্যোগ। তা না হলে শুধু মৌসুমি অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমানো কঠিন হবে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেন, এডিস মশার প্রজননস্থল ও লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। শুধু সরকার বা কোনো একটি প্রতিষ্ঠান একা পুরো দেশ পরিষ্কার রাখতে পারবে না। জনগণকে সম্পৃক্ত করেই ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রায় তিন মাস আগে থেকেই ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি শুরু করা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত রোগ নির্ণয়, সময়মতো উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে পাঠানো ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রায় দুই হাজার চিকিৎসককে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ডেঙ্গু প্রতিরোধে টিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে কয়েকটি সম্ভাবনাময় ডেঙ্গুর টিকা নিয়ে গবেষণা চলছে। বাংলাদেশেও ডেঙ্গুর বিভিন্ন ধরন দেখা দেয়ায় ভবিষ্যতে টিকার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রতিরোধ, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা। এর মাধ্যমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যুহার কমাতে চায় সরকার।




Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: