একটি মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র। একটি বেসরকারি অফিস। আরেকটি কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিও। প্রতিষ্ঠান তিনটি, অবস্থানও রাজধানীর তিন প্রান্তে। তবে গত দুই দিনের ব্যবধানে ঘটে যাওয়া তিন ঘটনায় অদ্ভুত এক মিল রয়েছে, জায়গা বা জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ।
এর মধ্যে গত শনিবার রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় আবাসন প্রকল্পে জায়গা নিয়ে বিরোধে হামলা ও লুটপাটের শিকার হয়েছে দেশের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও। এর আগে, বৃহস্পতিবার রাতের আঁধারে দুই শতাধিক মানুষ তান্ডব চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় রাজধানীর মিরপুর এলাকায় অবস্থিত প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ভেঙে ফেলে চিকিৎসা সরঞ্জাম, টিকা, ওষুধ, আসবাবসহ বিভিন্ন সামগ্রী। এই ঘটনায় একজন সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপির সম্পৃক্ততার খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া গত শুক্রবার মোহাম্মদপুরে দিনের আলোয় শতাধিক দুর্বৃত্ত একটি অফিসে ঢুকে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করে জমি দখলের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তিন ঘটনায়ই অভিযোগের তীর সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তদের দিকে। কোথাও শতাধিক, আবার কোথাও দুই শতাধিক মানুষ হামলায় অংশ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীতে জমি বা জায়গা নিয়ে বিরোধ মেটাতে কি এখন আইনগত পথের বদলে দলবল নিয়ে দখল নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অবশ্য তিন ঘটনাকেই জমি বা জায়গা নিয়ে বিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রাথমিকভাবে দেখছে। তবে কার জমির মালিকানা বৈধ, কারা হামলা করেছে এবং কার নির্দেশে হামলা হয়েছে, এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
ছয় ঘণ্টার তান্ডব মিরপুরে : মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের শাহ আলী মাজারসংলগ্ন এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা, গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা এবং টিকাদানসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। গত বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে সেখানে হামলার অভিযোগ ওঠে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র ও ভবন ভাঙার সরঞ্জাম নিয়ে কেন্দ্রে ঢোকে। দুই নিরাপত্তারক্ষীকে জিম্মি করে শুরু হয় ভাঙচুর। ভোর পর্যন্ত চলে তান্ডব।
একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি টিকা, ওষুধ, ভ্যাকসিন, আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, জেনারেটর, ফ্রিজ, এসি, আসবাবসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির।
মামলার এজাহারে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার দাবি করেছেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে তারা সরকারি চুক্তির মাধ্যমে জমিটি ব্যবহার করছেন। ১৯৭৬ সাল থেকে সেখানে কার্যক্রম পরিচালনার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালতের মাধ্যমে সমাধান করা যেত। কিন্তু একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান রাতের আঁধারে ভেঙে ফেলার কোনো যুক্তি নেই। ভাঙচুরের পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর নামে ব্যানার টাঙানো হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ঘটনাস্থলে একটি সাইনবোর্ডে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া ১০ কাঠা জমির মালিক হিসেবে সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির নাম দেখা যায়। অর্থাৎ জমির মালিকানা নিয়েই মূল বিরোধ বলে ধারণা করছে পুলিশ। তবে এই জমির বৈধ মালিকানা কার— তা আদালত ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন : মিরপুরের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, কয়েক ঘণ্টা ধরে ভাঙচুর ও লুটপাট চললেও তা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছেন, এত বড় স্থাপনা ভাঙতে আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা যথেষ্ট নয়। ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদেরও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে। এ জন্য তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনারের ভাষ্য, অপরাধী যে পরিচয়েরই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। ঘটনার পরও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বাইরে সরকারি টিকাদান কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছে। কেন্দ্রের মূল ভবন ভেঙে যাওয়ায় বাইরে বসেই শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এবার মোহাম্মদপুরে অফিস : মিরপুরের ঘটনার এক দিন পর শনিবার সকালে মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার সাত মসজিদ হাউজিংয়ে একটি অফিসে হামলা ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগী জয়নাল আবেদিনের অভিযোগ, সকাল ১০টার দিকে ১০০ থেকে ১৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি মোহাম্মদপুর টুইন টাওয়ারের দ্বিতীয় তলায় তাঁদের অফিসে ঢুকে দরজা, তালা ও জানালা ভাঙচুর করেন। পরে বিভিন্ন কক্ষ ও স্টোররুম থেকে নগদ ১৫ লাখ টাকা, পাঁচটি ল্যাপটপ, দুটি এসি, তিনটি সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আসবাবপত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁরা স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় কিছুদিন ধরে অফিসটি দখলের চেষ্টা করছিলেন।
পুলিশ অবশ্য ঘটনাটিকে জমি দখলের বিরোধ হিসেবে দেখছে। তেজগাঁও জোনের এডিসি জুয়েল রানা জানান, ওই এলাকায় জমির দখল নিয়ে বিরোধ রয়েছে। ঘটনার সময় ১৫০ থেকে ২০০ জন লোক বেআইনিভাবে জমিতে ঢুকে টিনের বেড়া ভেঙে ফেলে। পরে অফিসে ভাঙচুর করে নতুন করে টিনের বেড়া দিয়ে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করা হয়। তাঁর ভাষ্য, উভয় পক্ষই জমির মালিকানা নিয়ে নিজ নিজ কাগজপত্র থাকার দাবি করছে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ইসিবিতে স্টুডিওতেও হামলা : এদিকে রাজধানীর ইসিবি চত্বরের দক্ষিণ মানিকদীর নিউ গিনি প্রোপার্টিজ আবাসন প্রকল্পে শনিবার রাতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সেখানে ভাঙচুর করা হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’।
পুলিশের ভাষ্য, স্টুডিওটি হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল না। জায়গা দখলকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধের মধ্যে স্টুডিওটি ভাঙচুরের শিকার হয়। স্টুডিওতে থাকা ব্যক্তিদের ভাষ্য, প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জনের একটি দল শাটার ভেঙে ভেতরে ঢোকে। পরে স্টুডিওর মালামাল নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সেখানে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকেও মুঠোফোন ও মানিব্যাগসহ ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নেওয়া হয়। সালমান মুক্তাদির পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে বলেন, তাঁর মনে হয়েছিল ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে হামলা হয়েছে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, পুরো প্রকল্পকেন্দ্রিক বিরোধের জেরেই হামলা হয়েছে বলে তাঁর ধারণা। নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, কয়েক’শ লোক অস্ত্র নিয়ে প্রকল্পে ঢুকে গুলি ছোড়ে, গেট ভাঙে এবং মালামাল লুট করে। তবে তাঁর এসব অভিযোগেরও তদন্ত প্রয়োজন। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিন ঘটনায় একই প্রশ্ন : মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও ইসিবি, তিনটি ঘটনার সময় ও স্থান আলাদা হলেও অভিযোগের ধরন প্রায় একই। প্রথমে জমি বা জায়গা নিয়ে বিরোধ, এরপর দলবল নিয়ে প্রবেশ, স্থাপনা ভাঙচুর এবং মালামাল সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ।
এ ধরনের ঘটনায় শুধু সম্পত্তির মালিকানা নির্ধারণই যথেষ্ট নয়; হামলায় কারা অংশ নিয়েছে, কারা নেতৃত্ব দিয়েছে, লুট হওয়া মালামাল কোথায় গেছে এবং ঘটনার আগে বা পরে কোনো পক্ষ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে কি না, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসছে। বিশেষ করে মিরপুরের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্ত বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জমি নিয়ে বিরোধ থাকলে আদালত ও আইনগত প্রক্রিয়াই সমাধানের পথ। কিন্তু সেই বিরোধের জেরে শত শত মানুষ নিয়ে হামলা, ভাঙচুর বা দখলের চেষ্টা কোনোভাবেই আইনগত প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। রাজধানীতে পরপর এমন তিনটি ঘটনার পর তাই শুধু ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নয়, জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ হামলার পেছনে কারা, কীভাবে এবং কোন স্বার্থে কাজ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই এখন তদন্তের বড় চ্যালেঞ্জ।